গাভী বিত্তান্ত : মুক্তবুদ্ধি

 

(বইয়ের নাম: গাভী বিত্তান্ত, লেখক : আহমদ ছফা, বইয়ের ধরন : রাজনৈতিক উপন্যাস, প্রথম প্রকাশকাল : ১৯৯৫)

গাভী বিত্তান্ত তৎকালীন মুক্তচেতনাসমৃদ্ধ, আদর্শনীষ্ঠ ও প্রগতিপন্থী আহমদ ছফা কতৃক রচিত একটি সাট্যোয়ারমূলক উপন্যাস। যে উপন্যাসে বর্তামানময়তার ছফা তুলে ধরেছিলেন তৎকালীন সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের দলীয় লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি, রাজনৈতিক কোন্দল, অসুস্থ ছাত্ররাজনীতির ক্ষমতার প্রভাব, টেন্ডারবাজি, হল দখল আর আধিপত্য বিস্তার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি থেকে ব্যক্তিক পর্যায়ের আক্রমণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নিষ্ক্রিয়তা আর গোলামীর কদর্যতা। এসবকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠে পুরো উপন্যাসটির উপজীব্যতা। একের পর এক ঘটনাপ্রবাহ ঘটতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্র-শিক্ষকদের রাজনীতি আর গোঁড়া উপাচার্যকে নিয়ে। তারই রূপরেখা আহমেদ ছফা তুলে ধরেছিলেন এই শক্তিশালী উপন্যাসটিতে উপাচার্যের গাভী পালনকে কেন্দ্র করে। তবে মুক্তবুদ্ধি আর প্রগতিশীল চেতনাসমৃদ্ধ এই লেখক কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এ উপন্যাসটিতে উল্লেখ করেন নি।

উপন্যাসটির উপজীব্যতা সাধারণত সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়।তৎকালে ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন জৈবরসায়নের অধ্যাপক আব্দুল মান্নান।বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের গোলাগুলির ফেরে পড়ে মারা যায় উপাচার্যের গাভীটি।এ ঘটনাকেই উপজীব্য হিসেবে নিয়ে গাভী কেন্দ্রিক এ উপন্যাসটি রচনা করেন ছফা যা ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়।

লেখক ও বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা

বিশ্ববিদ্যালয় একটি মুক্তবুদ্ধির, মুক্তচেতনার আর মুক্তরাজনীতির জায়গা। কিন্তু এসবে কোনটাই দেখা যায় না উল্লেখিত উপন্যাসে। বরং বিশ্ববিদ্যালযের শিক্ষকরা ডোরাকাটা দল, হলুদ দলে বিভক্ত হয়ে দলাদলি করছেন আর আন্তঃব্যাক্তিক সম্পর্কে বিষ ঢেলে দিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এই দলাদলির মধ্যই রসায়নের অধ্যাপক নিরেট গোবেচারা, নিরীহ ধরণের মানুষ মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ ডোরাকাটা দলের দিলরুবা খানমের হাত ধরে হয়ে উঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। উপাচার্য হওয়ার পর থেকে ঘটে যায় মির্জা জুনায়েদের সাথে একেক ঘটনা। উর্পযুক্ত হিতাহিতজ্ঞান আর যোগাত্যতার অভাববোধ থাকা সত্তেও উপাচার্যর চেয়ারে আসীন হলে যা হওযার, তাই ঘটে মির্জা মুহাম্মদ আবু জুনায়েদ এর জীবনে।বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনা জুনায়েদ সাহেব সামাল দিতে পারেন। পারেন না এমন না; বরং সামাল দেওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র খুন হওয়া নিয়ে দুই ছাত্রদলের কোন্দল, মহিলা হোস্টেলে বিদ্যুৎের ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণের ফলে হোস্টেলে পানির সরবরাহের ব্যাঘাতে নানামুখী সমস্যা, ক্ষমতাসীন ছাত্রদলের নেতাদের টেন্ডারবাজি, বিবেকানন্দের ভাস্কর্য স্হাপন নিয়ে মৌলবাদী আর প্রগতিশীলতান ঘ্যান্জাম, নজরুল নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য এসবের মাধ্যমে মির্জা সাহেবের অযোগ্যতা প্রতীয়মান হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থী মহলে।ফলে সমালোচনা মুখে পড়ে মির্জা।

চারদিকের এসব চাপের মুখেই জুনায়েদ সাহেবের সাথে পরিচয় ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকাদার শেখ তবারক আলীর সাথে।যিনি তার মিয়া জুনায়েদ এর শ্বশুরের হাত ধরে ঠিকাদারিতে উঠে আসেন। এভাবে উপাচার্যের ঘনিষ্ঠতা হয় তবারক আলির সাথে। আর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক সব ঝামেলায় হতবিহ্বল হয়ে মিয়া জুনায়েদ এর মাথায় উপাচার্য ভবনে স্রেফ গাভী পালার ভূত মাথায় চেপে বসে! এ চেপে বসায় সোনায় সোহাগা মেলে যখন তবারক আলী গাভী এনে দিবে বলেতার পরিচিত ফার্ম থেকে।

শুরু হলো উপাচার্য ভবনে গাভী পালন! এ খবর বাতাসের বেগে ছড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে।শুরু হয় আবারো মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ এর সমালোচনা। এর মাঝেই উপাচার্য ভবনে গোয়াল ঘরে পাশে আড্ডার আসর জমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের।সেখান থেকেই প্রতিবাদ উঠে আসে এ সমালোচনার।

পরিশেষে গোয়াল ঘর থেকেই পরিচালিত হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজকর্ম।এই কিম্ভূতকিমাকার ব্যবস্থা আর উপাচার্যের গাভী দেখতে অনেকেই ভীড় জমায় উপাচার্য ভবনে! শুধু গাভী দেখতে নয়, গাভী দেখার নামে ছাত্রনেতা হতে শিক্ষক স্বীয় তদবিরের জন্য আসেন যেনো উপাচার্য মহোদয় একটু সুপারিশ করেন।

উপাচার্য ভবনে গাভী পালন, ডোরাকাটা আর হলুদ দলের রেষারেষি, ছাত্র রাজনীতি, উপাচার্যের গোড়ামি, স্বীয় বউয়ের উচ্চাকাঙ্খার আর পারিবারিক কলহের মধ্য দিয়েই এ উপন্যাসেটির পরিসমাপ্তি টানেন আহমেদ ছফা।

এই পরিসমাপ্তির ফল এখনো বয়ে বেড়ায় আমাদের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৯৫ সালে রচিত এ উপন্যাসটি যেনো বর্তমানকেই প্রকাশ করে বেশ!

 

  • গ্রন্থ সমালোচক : মেহেদী হাসান

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ