সাম্যের সংস্কৃতি, ও অসাম্যেও গ্রাসে : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

নামে যতই কাছাকাছি হোক-না কেন, লোকসংস্কৃতি এবং গণসংস্কৃতি এক জিনিস নয়। ফারাক আছে, মৌলিক। লোকসংস্কৃতি তার পৃষ্ঠপোষকদেও ব্যাপার, গণসংস্কৃতি জনগণের। পৃষ্ঠপোষকেরাই লোকসংস্কৃতি বলে আলাদা একটি সংস্কৃতি দাঁড় করায়। সাজিয়ে রাখে। পেছনে কখনো কাজ করে ভেজা করুণা, কখনো তাজা ব্যবসায়ী বুদ্ধি। এই পৃষ্ঠপোষকেরা কৌতূহলের সঙ্গে গবেষণা করে নৃতাত্ত্বিক সত্য খুঁড়ে খুঁড়ে বার করতে চায়। আবার প্রদর্শনীরও আয়োজন করে কেউ কেউ। তাতে বিনোদন জোটে। বৈচিত্র্যের স্বাদ পাওয়া যায়। যেমনটা ঘটে চিড়িয়াখানায় কিংবা কোনো বিচ্ছিন্ন জনপদে বেড়াতে গেলে। কেউ কেউ আবার অনুকরণ করতে চায় লোকসংস্কৃতির। আমেরিকার হিপ্পিরা যেভাবে হরে কৃষ্ণ করে পাগল হয়। লোকসংস্কৃতি টেলিভিশনেও দেখানো যায়। লোকসংস্কৃতির বাজার দরটা মন্দ নয়। কিন্তু গণসংস্কৃতি জিনিসটা ভিন্ন। সেটা জনগণ নিজেই গড়ে তোলে; ব্যবসায়ের প্রয়োজনে নয়, জীবনযাপনের কারণে। এতে আর যাই থাক পৃষ্ঠপোষকতার কোনো স্থান নেই। গণসংস্কৃতি বৈচিত্র্যকে মানে, স্বাতন্ত্র্যকে অবশ্যই স্বীকার করে। কিন্ত ধনী-গরীবের বিভাজনটাকে পোক্ত করতে চায় না, সেটাকে বরঞ্চ ভেঙ্গে ফেলবার আকাঙ্ক্ষা রাখে। লোকসংস্কৃতি স্থির ও সংরক্ষিত; আর গণসংস্কৃতি হচ্ছে সর্বদাই বিকাশমান, চরিত্রগতভাবেই সে প্রগতিশীল।

একটা দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক। আমাদের দেশে এই যে বাউলদের সংস্কৃতি, এটা হচ্ছে গণসংস্কৃতি, কিন্তু চেষ্টা হচ্ছে একে লোকসংস্কৃতিতে পরিণত করবার। চেষ্টাটা অবশ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সরল কথায় মতলবাজির। বাউলেরা যে একটা নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে তার পেছনে কোনো পৃষ্ঠপোষকের করতালি ছিল না, যেমন ছিল না ব্যবসায়ীর গোপন কারসাজি। বরঞ্চ আধিপত্য ছিন্ন করেই তার অভ্যুত্থান ও অস্তিত্ব। আমাদের এই ভূখণ্ডে এক সময়ে ব্রাহ্মণ্যবাদ একচ্ছত্র ছিল, একটি স্রোতে ভেলা ভাসানো, অপরটি ভিটেমাটি, গাছপালা আঁকড়ে ধরে কোনোমতে বেঁচে থাকা। বাউলরা এই দু’টির কোনোটাই করে নি। ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য মেনে নেয় নি; কিংবা তার বর্ণভেদ প্রথায় অংশ হয়ে গিয়ে যাচ্ছে। আরেকটা দুর্দশার আশঙ্কাও মাঝে মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সেটা আদর্শিক। জাতীয় দৈনিকের একটি প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃতি দিই। ‘১৯৮৪ সালে লালন একাডেমীর সভাপতি ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক… লালনকে সুন্নী শরিয়তী মুসলমান হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং লালনের মৃত্যুবার্ষিকীতে মাজার প্রাঙ্গণে ‘বেশরিয়তী পথ’ থেকে ফিরে আসতে বাউলদের জন্য তওবা করার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন’ বুঝুন তাহলে। মোনেম খাঁরা যা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেন নি, সেই অপূর্ণ সাধ একালে, এই গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে ঠিকই পূরণ হচ্ছে।


রাষ্ট্র ঠিক করেছে লালনের মাজার এলাকাটাকে আধুনিক করবে। সেখানে অতিথি ভবন, উন্মুক্ত মঞ্চ, মিলনায়তন, বনভোজন কেন্দ্র, নৌকাবিহারের ব্যবস্থা ইত্যাদি করা হবে। টাকাও মঞ্জুর করা হয়েছে, তিন কোটি চৌষট্টি লক্ষ টাকা। কাজটা একাডেমীর তত্ত্ববধানে হবে। তাছাড়া পাঁচশ’ ম্যাট্রিক টন গমও দেওয়া হয়েছে একাডেমীকে, খরচ করার জন্য। আর যায় কোথায়, চুম্বক যেমন লোহাকে টানে, লালন একাডেমী তেমনি পৃষ্ঠপোষকদের টানতে শুরু করেছে। কেবল নির্মাণের ঠিকাদারি আর গম তো নয়। আরো অনেক কিছুর সম্ভাবনা জ্বলজ্বল করছে। দোকানপাট উঠবে, বরাদ্দ হবে। মেলাতে তো বটেই, মেলার সময়ে তো লক্ষ লোক আসবেই; সারা বছর ধরেই পর্যটকদের আনাগোনা ঘটবে। বাকি সময়ে মিলনায়তনকে কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ভাড়া দেওয়া যাবে। বিরাট বাণিজ্য। সর্বোপরি নামে বেনামে জায়গা-জমি দখলের ব্যাপারটাও রয়েছে।
সবটাই যাবে পৃষ্ঠপোষকদের হাতে ও পেটে। অসহায় বাউলেরা বুঝতে পেরেছে তারা উৎখাত হয়ে যাবে। কেননা লালন একাডেমীতে বাউলেরা নেই, বাউল ছাড়া সবাই আছে। প্রতিবেদন বলছে, এক সময়ে এর সদস্যসংখ্যা ছিল একশ’ পঞ্চাশ জন, এখন তা বেড়ে হয়েছে এক হাজার তিনশ’ জন। কোনো অসুবিধা নেই, বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিকই এর সদস্য হতে পারে। একজন বলেছেন, ‘চোর, বদমাইশ, ছিনতাইকারী, সমাজবিরোধী ব্যক্তিরা এখন একাডেমীর সদস্য। সদস্য নয়, আসলে ভোটার।’ প্রতিষ্ঠানটি খুবই গণতান্ত্রিক। ভোটের মধ্যদিয়ে কমিটি হয়, হয়েছে, এবং বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সরকারি দলের লোকেরাই যথারীতি নির্বাচিত হয়েছেন। সকল কর্তৃত্ব এখন তাদের হাতে। বিপন্ন বাউলেরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। সাময়িক স্থগিতাদেশও পেয়েছিলেন। তাঁরা তখনকার প্রধানমন্ত্রীর কাছে দরখাস্ত করেছিলেন যাতে লালনের সমাধিকে লালন একাডেমীর হাত থেকে মুক্ত করে বাউলদের হাতে অর্পণ করা হয়। দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি তাদের দাবিকে সমর্থন করে বিবৃতি দিয়েছিলেন, কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনও বাউলদের নিজস্বতা রক্ষাকারী পরিবেশের ওপর হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে বলেছে। লালন আখড়া রক্ষার জন্য নাগরিক কমিটিও গঠিত হয়েছে। এসব প্রতিরোধ ঘটেছে কিন্তু পৃষ্ঠপোষকেরা ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছেন তাঁদের নিজস্ব পরিকল্পনা নিয়ে। ওই এলাকার ওপর আধিপত্য নিয়ে দুই দল সন্ত্রাসীর মধ্যে যথারীতি সংঘর্ষও বেধেছে; এবং দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছে। খুনোখুনি হয়তো আরো হবে; বিচিত্র নয়। তবে তাতে বাউলদের কোনো লাভ হবে না।

আমরা বলি কি, গণসংস্কৃতি ওই মেয়েটিকে ধ্বংস করবে না। উন্নতি তো আপনারা সর্বত্রই ঘটাচ্ছেন, বাউলেরা না-হয় অনুন্নতই রইলো। আধুনিকীকরণ ঘটাতে চান, তার জন্য অনেক জায়গা খালি পড়ে রয়েছে। যেমন বিদ্যুৎ ও বিদ্যা। ওই দু’টিকে সর্বজনীন করুন। দেখবেন সমস্ত দেশ কেমন উন্নত ও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। মানুষের কর্মসংস্থান করুন, দেখবেন লোকের মুখের হাসি এসেছে। নদীগুলোকে সচল করুন, দেখবেন বাংলাদেশ প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। গাছপালা রক্ষা করুন, নইলে মানুষ বাঁচবে না। আর পর্যটন কেন্দ্র? তার জন্য অনেক কেন্দ্র রয়েছে। সাগর সৈকত আছে, একটানা অতবড় সৈকত নাকি দুর্লভ, তাকে আধুনিক করুন। পুরাকীর্তিগুলো যাতে আকর্ষণীয় ও দর্শণীয় হয় তার ব্যবস্থা করতে পারেন। সুন্দরবনও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে খারাপ হবে না। বেচারা লালন ফকিরকে সেখানেই নিরুপদ্রবে ঘুমাতে দিন যেখানে শায়িত রয়েছেন; তাঁর অনুসারীদেরকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেবেন না যেটা তাদের আশ্রয়। ব্যবসায়ী, চাঁদা আদায়কারী, পুলিশ ও মাস্তান, জবরদখলকারী, মাদক ব্যবসায়ী, প্রমোদলোভী এরা তো সারা বাংলাদেশ জুড়েই অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে; তাদের জন্য নতুন একটি কেন্দ্র স্থাপন কি এতই অপরিহার্য? তদুপরি মোনেম খাঁরা যে কাজ করতে চেয়ে সে কাজ কি আমাদের সাজে? আরো তো মুক্তিযুদ্ধের পকাতাবাহী। লোকসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক অনেক আছে, আরো পাওয়া যাবে, গণসংস্কৃতির সমর্থক আজ খুব বেশি বেশি প্রয়োজন।


ইতিমধ্যে আরেক ঘটনা ঘটেছে। সেটা হচ্ছে সংস্কৃতির বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতা। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ক্ষতিকর কেননা রাষ্ট্র জনগণের নয়। ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতা আরো খারাপ কেননা তা হচ্ছে সরাসরি মুনাফালাভের সঙ্গে যুক্ত কালো টাকার মালিকেরা দেখা যাচ্ছে আর্ট গ্যালারি খুলছেন, আসর বসাচ্ছেন গানবাজনার, উদ্যোগ নিচ্ছেন পত্রিকা প্রকাশের। ব্যাপারটা খারাপ হতো না উদ্দেশ্যটা যদি হতো সংস্কৃতির অগ্রগতিতে সাহায্য করা। কিন্তু উদ্দেশ্য তো সেটা নয়, উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজেদেরকে সম্মানিক করা। সংস্কৃতিসেবীদেরকে পুঁজির সেবক করে তোলা, পারলে মুনাফা করা, না-পারলে লোকসান দেখিয়ে কর ফাঁকি দেওয়া। বিদেশী কোম্পানিগুলো সংস্কৃতি চায় না, তারা ক্রেতা চায়; তারা যখন সংস্কৃতির সেবায় উদ্যোগী হয়, তখন অভিপ্রায়টি থাকে নিজেদের পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়ায়। সংস্কৃতি পদানত হচ্ছে পণ্যে। পুঁজিবাদের গ্রাস থেকে সংস্কৃতিকে রক্ষা করা, এবং সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সমবেতভাবে চেষ্টা করা দরকার। চেষ্টাটা সমষ্টিগতই হবে। সাংস্কৃতিক সংগঠন চাই, পাড়ায়, মহল্লায় পাঠাগার, নাটক, গানবাজনার অনুষ্ঠান চাই। কিন্তু সবকিছুর ভেতরে থাকবে আদর্শবাদিতা। আদর্শবাদিতার লক্ষ্য হবে মানুষের মধ্যে মানুষের মৈত্রী গড়ে তোলা, বিচ্ছিন্নতা দূর করা, নিজের সুখকে সকলের সুখের অংশ করা এবং সকলের সুখের সাথে নিজের সুখকে মিলিয়ে দেওয়া। এর জন্য সর্বাগ্রে চাই মাতৃভাষার চর্চা। একজন মাত্র বিদেশীর উপস্থিতির দরুন যখন আলোচনা সভার সমস্ত কার্যকলাপ বাংলায় না-হয়ে ইংরেজিতে হয় এবং সেই আলোচনার বিষয়বস্তু থাকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তখন বুঝতে কষ্ট হয় না আমরা কোনদিকে যাচ্ছি। সংস্কৃতির জন্য ওই পথটা মুক্তির নয়, পুরাতন দাসত্বের বটে।

পৃষ্ঠপোষকতা নয়, দরকার চর্চার। দরকার সংস্কৃতির ভেতরকার গণতান্ত্রিক উপাদানগুলোকে পুষ্ট করা। সেটা হচ্ছে না। মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতার দরুন আমরা সেই জগতে চলে যাচ্ছি যে-জগৎ মানুষের নয়, পশুর। মনুষ্যত্ব রক্ষিত হবে না যদি আমরা যেন না-ভুলি যে রাষ্ট্রের চেয়ে সমাজ বড় এবং সমাজের চেয়েও বড় সংস্কৃতি। যদিও সংস্কৃতি ভর করে থাকে সমাজের ওপর, তাকে বসবাস করতে হয়, রাষ্ট্রে অধীনে। সংস্কৃতি বড় কেননা তার ভেতর সংরক্ষিত আছে আমাদের সমষ্টিগত স্মৃতি, যা আমাদের পরিচয় এবং সংস্কৃতিতেই রয়েছে আমাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। একা আমরা কেউ পারবো না, এমনকি টিকবোও না। বাঁচতে হলে চর্চা চাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির। রাজনীতিই চালক, কিন্তু সংস্কৃতি হচ্ছে চলার পাথেয়।

 

  • সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ