(১)
প্রথম আলোতে এসেছে খবরটা। প্রথম আলো লিখেছে, “পাহাড়ে নতুন নামে উগ্রপন্থী কার্যক্রম পরিচালনা করেছে আল-কায়েদা মতাদর্শী একটি জঙ্গিগোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী দাওয়াতুল ইসলাম নামের একটি সংগঠনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ ও দাওয়াতি কাজ চালাচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত একাধিক সূত্র জানায়, দাওয়াতুল ইসলাম নামের সংগঠনের আড়ালে পার্বত্য এলাকায় এই উগ্রবাদী কার্যক্রমের নেতৃত্বে আছেন মাহমুদুল হাসান গুনবী। তিনি বান্দরবানের লামা ও খাগড়াছড়িতে দুটি জঙ্গি আস্তানাও গড়ে তুলেছেন। সেখানে এই গোষ্ঠী ২০ থেকে ২৫ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে।
জঙ্গি কার্যক্রমে গোয়েন্দা নজরদারিতে যুক্ত একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, “উগ্রবাদী ওয়াজের জন্য পরিচিত মাহমুদুল হাসান গুনবী বর্তমানে আনসার আল ইসলামের আধ্যাত্মিক নেতা। তবে তিনি কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন, দাওয়াতুল ইসলাম নামের একটি সংগঠনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই সংগঠনের কার্যক্রমের নামে পার্বত্য অঞ্চলে এবং উত্তরবঙ্গে চরাঞ্চলের কিছু এলাকায় আনসার আল ইসলামের কার্যক্রম ও উগ্র মতাদর্শ প্রচার করে আসছেন। আনসার আল ইসলাম নিজেদের আল–কায়েদার ভারত উপমহাদেশের (একিউআইএস) শাখা দাবি করে থাকে।”
দেখেন, একজন মানুষ হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হবে নাকি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃস্টান হবে নাকি বৌদ্ধ হবে এইগুলি একান্তই তাঁর নিজের ইচ্ছা। এক ধর্ম ত্যাগ করে আরেক ধর্ম গ্রহণ করা আমার কাছে খুব বুদ্ধিমান কোন সিদ্ধান্ত মনে হয় না। তারপরেও মানুষ ধর্মান্তর করে, নানা কারণেই করে। আমাদের এখানে আমাদের পূর্বপুরুষরা অনেকেই ওদের নিজেদের পূর্বের ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেছে। খৃস্টান মিশনারিরা গ্রামে গঞ্জে পাহাড়ে জঙ্গলে সর্বত্র খৃস্ট ধর্ম প্রচার করে, অনেক লোক খৃস্ট ধর্ম গ্রহণও করে। গারো, লুসাই, বম এইসব জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই আমাদের দেশে খৃস্টান হয়ে গেছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এখনো প্রতিদিন হাজার হাজার লোক ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃস্ট ধর্ম গ্রহণ করে।
আমাদের এখানেও মাঝে মাঝেই খবর পাই যে কোন হিন্দু ধর্মের লোক মুসলমান হয়েছে বা বৌদ্ধ ধর্মের লোক মুসলমান হয়েছে। ইউরোপে আমেরিকায়ও লোকে এক ধর্ম ত্যাগ করে আরেক ধর্ম গ্রহণ করে। এই সবই হচ্ছে যার যার ইচ্ছা। আপনি আমি তো আর একজনকে কোন ধর্ম গ্রহণ বা ত্যাগ করতে বাধা দিতে পারি না আবার বাধ্যও করতে পারিনা। এটা সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু সমস্যা হয় দুইটা জায়গায়। প্রথমত, যখন একদল লোক শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদেরকে ধর্মান্তরে উদ্বুদ্ধ করে সেটা অন্যায়। দ্বিতীয়টা হচ্ছে যখন ধর্ম প্রচারের আড়ালে কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা হিংসা বিদ্বেষ প্রচার করে।
আমাদের পাহাড়গুলিতে এই দুইটাই ঘটছে। বান্দরবান জেলায় ও খাগড়াছড়ি জেলার কোন কোন এলাকায় ছোট ছোট আদিবাসী শিশুদের মধ্যে ইসলাম ধর্ম প্রচার করছে মৌলভি সাহেবেরা এইরকম খবর ছবি ইত্যাদি দেখেছি। এইটা তো ঠিক না। প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে আপনি ধর্ম প্রচার করেন। কেউ যদি চিন্তা ভাবনা করে বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনার ধর্ম গ্রহণ করে, ভাল কথা। করুক। কেউ কেউ একাধিকবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে এবং প্রতিবারই তার কিঞ্চিৎ প্রাপ্তিযোগ হয়েছে সেরকম খবরও দেখেছি। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যা ইচ্ছা তাই করুক। কিন্তু শিশুরা কেন? অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের কেন প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন?
(৩)
আরেকটা হচ্ছে সন্ত্রাস ও হিংসা বিদ্বেষ ছড়ানো। এটা ছাড়াও পাহাড়ে আরেকটা কাজ হয়, সেটেলারদের মধ্যে আদিবাসী বিরোধী ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো হয় বলে অভিযোগ আছে। সেটেলার আর আদিবাসীদের মধ্যে সম্পর্ক এমনিতেই খুব প্রীতিকর নয়। সেখানে যদি আবার সেটেলারদের মধ্যে ওয়াজ নসিহত এইসবের নামে বিধর্মী কাফেরদের বিরুদ্ধে ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো হয় তার ফল তো ভাল হয়না আরকি।
প্রথম আলো দায়িত্বশীল কাগজ। ভাল কাজ করেছে খবরটা প্রকাশ করেছে। আশা করি সরকারের দায়িত্বশীল লোকজন নজর দেবেন বিষয়টাতে। বিশেষ করে জঙ্গি যেসব সংগঠন ইসলামী দাওয়াতের নামে দল বড় করছে, ওদেরকে যদি চিহ্নিত করেন তাইলে ভাল হয়। আবার বলছি, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বৌদ্ধ ধর্ম বা হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হতে চাইলে বা খৃস্টান হতে চাইলে তাতে তো কারো কিছু বলার থাকে না। কিন্তু শিশুদেরকে যেন কেউ টার্গেট না করে আর সন্ত্রাস বা ঘৃণা বিদ্বেষ যেন না ছড়ায়। ধর্ম প্রচার করা আপনার অধিকার- সন্ত্রাস বা ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো আপনার অধিকার নয়।
  • ইমতিয়াজ মাহমুদ : আইনজীবী