শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আজ আমার জন্য একটি অত্যন্ত বিশেষ দিন। আজ আমার বড় ভালোবাসার কন্যা বিয়াংকা এবং বড় আদরের প্রিয় প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন।
শুভ জন্মদিন বিয়াংকা!
শুভ জন্মদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়!
বিয়াংকার জন্ম যেমন আমার জীবনে বিশাল পরিবর্তন এনেছে তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও আমার জীবনে বিশাল অবদান রেখেছে। উভয়ের কাছেই আমি ঋণী। উভয়েই আমাকে শিখিয়েছে অনেক। পিতা হওয়া শিখতে হয়। পিতা হওয়া এমন জিনিস না যে টুপ্ করে পিতা হয়ে গেলাম। বিয়াংকার কারণে আমি প্রথমবার পিতা হই। সেইদিন পিতা হওয়ার আনন্দ প্রথম টের পাই। আসলে হঠাৎ করে একবারে পিতা হয়ে যাইনি। ও আমাকে আস্তে আস্তে পিতা হয়ে উঠতে শিখিয়েছে। ও আমাকে প্রতিদিনই একটু একটু করে আরো উন্নততর মানুষে রূপান্তরিত হতে শিখিয়েছে। ও আমাকে জীবনকে বুঝতে শিখিয়েছে। ও আমাকে আমার জীবনকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। পিতা হিসেবে জীবনের বহু শিক্ষা তার কাছেই। ওর প্রতিদিনের আদরে ভালবাসায় মায়া-মমতায় আমি পিতা হয়ে উঠছি। এখনো পিতা হয়ে উঠিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্তই শিখব জানব। বহু কিছু শিখেছি এবং আরো অনেক কিছু শিখব।
তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে শিখিয়েছে অনেক। মানুষের জীবনের শ্রেষ্ট সময় হলো ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়স। এই সময়েই মানুষের জ্ঞানের পরিবর্তনের হার সবচেয়ে বেশি হয়। সেই সময়ের শ্রেষ্ট সময়টা কাটিয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্র হিসাবে থাকার কথা ছিল ৪ বছর কিন্তু এরশাদের কল্যানে থেকেছি ৮ বছর। পেছন ফিরে তাকালে মনে হয় এটাও শাপে বর হয়েছে। দীর্ঘ সময় থাকার কারণে অনেকের সাথে বন্ধুত্বটা দীর্ঘায়িত হয়েছে। পড়াশুনাটা দীর্ঘসময় মাথায় রাখতে হয়েছে। ফলে বুঝতে পারার সময় পেয়েছি। অনেকদিন থাকার কারণে কার্জণ হলের প্রতি যেন কি মায়া জন্মে যায়। কি এক মায়ার বন্ধনে আটকে যাই। বিদেশে গিয়েও কার্জণ হলকে মাথায় করে নিয়ে গিয়েছি। এইটা আমাকে বিদেশে থাকতে দেয়নি। কয়েকদিন কার্জণ হল না দেখলে মনটা আশপাশ করে। যদিও সেখানে অনেক সমস্যা। কার্জণ হলকে আরো অনেক সুন্দর করা যেত। যত্রতত্র ভবন বানিয়ে এটাকেও নষ্ট করে ফেলছি। তথাপি যা আছে সেটাও অপরূপ সুন্দর।
কার্জণ হলকে বিশেষভাবে ভালো লাগে কারণ এখানে সত্যেন বোসের হাত ধরে কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্টিক্সের জন্ম। ভালো লাগে কারণ কার্জণ হলের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অনেক বড় বড় মানুষের পদচারণা ছিল। খারাপ লাগে আমরা তাদের লিগ্যাসি ধরে রাখতে পারিনি। নোংরা ছাত্র এবং শিক্ষক রাজনীতি আমাদের সব শেষ করে দিচ্ছে। সেই কথা না হয় আজ নাই বলি। এইটুকুই কম কি যে আমি সেই পথ দিয়ে হাঁটছি হাঁটতে পারি যেই পথ দিয়ে একদিন সত্যেন বোস, কৃষ্ণান, রফিকুল্লাহ স্যার, হারুন স্যার, আহমেদ শফী স্যার, কবির স্যারসহ আরো অনেকের পদ চিহ্ন যেখানে পড়েছে সেই পথে আমিও হাঁটি।
আমার কন্যা যেমন আমাকে পিতা বানিয়েছে এবং প্রতিনিয়ত বানাচ্ছে তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও আমাকে শিক্ষক বানিয়েছে, ছোটখাটো একজন গবেষক বানিয়েছে। শত শত ছাত্র ছাত্রী প্রতিনিয়ত আমাকে একজন শিক্ষক হয়ে উঠতে সাহায্য করছে। শিক্ষকও হঠাৎ করে নাজিল হওয়া যায় না। একটু একটু করে হয়ে উঠতে হয়। আমি যে প্রতিনিয়ত আমার ছাত্র ছাত্রীদের কাছ থেকে শিখি। যতটুকুই গবেষণা করতে পারছি তার জন্য আমার ছাত্রদের কাছে ঋণী। আমি মাস্টার্সে একটা কোর্স পড়াই যেটা আমার নিজের হাতে গড়া। যার প্রতিটা বিষয়ে আমার নিজের গবেষণা আছে। এই সাবজেক্ট প্রতিবার প্রতিবছর যখন পড়াই পড়াতে গিয়ে গবেষণার জন্য নতুন আইডিয়া আসে। সেটা ছাত্রদের সাথে মিলেমিশে গবেষণা করি। বিদেশে থাকলে যেই সংখ্যায় গবেষণা করতে পারতাম সেই সংখ্যায় হয়ত পারিনা। কিন্তু বিদেশে বসে কাজ করলেতো নিজের একার অ্যাচিভমেন্ট হতো। এখানেতো নিজের ছাত্রছাত্রীদের সাথে কাজ করছি। আনন্দটাই অন্যরকম। এইসব কিছু সম্ভব হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে।
আমি জানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন ভালো নেই। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। কখন কবে সেটা হয়ত এখন জানিনা। ভালো থেকো আমার প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমার প্রিয় কন্যা।
  • ড. কামরুল হাসান মামুন : অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ