মার্কসবাদ : শ্যামল চক্রবর্তী

যা সত্য, সঠিক ও ন্যায্য, তাকে স্বেচ্ছায় সচেতনভাবে ধারণ ক’রে রাখা এবং বিকল্প অসত্য, ভ্রান্ত ও অন্যায় পথ বা লক্ষ্যকে অনুরূপবভাবে বর্জন করা- তার জন্য যে মূল্যই দিতে হোক বা যত যন্ত্রণাই সহ্য করতে হোক না কেন- এই যদি নীতিসম্পন্ন ব্যক্তির পরিচয় হয়, তাহলে কার্ল মার্কসকে ‘অন্যতম শ্রেষ্ঠ নীতিনিষ্ঠ’ বলে অভিহিত করা নিশ্চয়ই সঠিক হয়েছে। মার্কসের জীবনকাহিনী ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করলেই তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যাবে। সতেরো বছর বয়সের ছাত্রজীবনেই প্রচলিত ভাববাদী চিন্তাধারার বিপরীত পথে তিনি নিজেকে ‘বস্তুবাদী’ বলে ঘোষাণা করেছিলেন। তরুণ হেগেলপন্থীদের মধ্যে এসে তিনি নিজের চিন্তাভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় বেশ সমর্থ হয়েছিলেন। ফয়েরবাখের মধ্যে ভাববাদের জের ও দৃষ্টিভঙ্গির অনড়তাকে অস্বীকার ক’রে তিনি উদঘাটন করলেন বস্তুজগতে ও ভাবজগতে দ্বন্দ্বমূলক গতিবাদের সত্যকে। হেগেল ছিলেন ভুঁয়ে মাথা ঠেকিয়ে শূন্যে পা তুলে দাঁড়িয়ে, তাঁকে শক্ত মাটিতে দাঁড় করালেন। তরুণ বয়সে তাঁর বিভিন্ন রচনায় বা ‘রাইনিশে সাৎটুঙ্’ পত্রিকার সম্পাদনা উপলক্ষে লিখিত অনেক রচনায় ধনতান্ত্রি। শাসনব্যবস্থায় শোষণের মূল রূপটি অসামান্য অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে তিনি উদঘাটন করেছিলেন।

মার্কসবাদ ও মার্কসবাদী

শুধু তত্ত্বগতভাবে নয়, বাস্তব কর্মসূচি তথা আন্দোলনের সঙ্গে তিনি নিজেকে যুক্ত করেছিলেন বিশিষ্ট সক্রিয় ভূমিকায়। ব্যক্তিগত জীবনে ও আদর্শের ক্ষেত্রে কখনোই তিনি মাথা নুইয়ে আপসের পথে যেতে পারেননি। ‘বুর্জোয়া ফিলিস্টাইনদের’ প্রতি চরম উপেক্ষা প্রদর্শন ক’রে নিজের বিচার, বিশ্বাস, অভিজ্ঞতার প্রতি শক্ত থেকেছেন মার্কস। সত্যনিষ্ঠার জন্য কম মূল্য তাঁকে দিতে হয় নি- নির্বাসন, পুলিশি অত্যাচার, গ্রেপ্তার, আজীবন দারিদ্র্য, বন্ধুবিচ্ছেদ সমস্ত কিছুই বরণ করেছেন। এবং লড়াই করেছেন। সে লড়াই এমন কি সহকর্মী বা সহযাত্রীদের সঙ্গেও করতে হয়েছে। লাসালের সুবিধাবাদ বা বাকুনিনের নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ অতিপরিচিত। কিন্তু বিস্তৃত জীবনী আলোচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। আপাতত প্রাসঙ্গিত হচ্ছে- মার্কস জন্মাবার দুইশো বছর পরে আমরা ব্যক্তি মানুষ হিসাবে কী পেলাম, কী ধরবো প্রাত্যহিক জীবনযাপনের মধ্যে, কোন সত্যকে আমরা আঁকড়ে ধরে থাকবো?

মানবসভ্যতা অনেকই প্রাচীন। মার্কস জন্মাবার বহু আগে বুদ্ধ এসেছেন, খ্রীস্ট এসেছেন, মোহম্মদ এসেছেন এবং শ্রীমদ্ভগবতগীতার উদগাতা শ্রীকৃষ্ণ। বুদ্ধ বললেন- রোগ, শোক, জরা, মৃত্যুময় এই জীবনযন্ত্রণার চক্র থেকে মুক্তি চাও তো, আমি বলে যাচ্ছি, এই শীল অনুসরণ কর। খ্রীস্ট বললেন- আমি যে-পথ বলে গেলাম সেই কর্ম অনুসরণ কর, ঈশ্বর তোমার প্রতি করুণা করবেন। এই ক্ষণিকের জীবনবন্ধন উত্তরণ করতে পারলে আখেরি বিচারে স্বর্গের রায় তোমার সপক্ষে। গীতায় কথিত হল- যে মন ও বুদ্ধি ঈশ্বরে অর্পণ করেছে, যার মানসিক ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও যার কর্মপ্রেরক বুদ্ধি সর্বস্বই ঈশ্বরে অর্পিত, সে-ই ঈশ্বরের প্রিয় ভক্ত। মোহম্মদ বললেন- ঈশ্বরের নির্দেশ আছে কোরাণে, হাদিসে; অনুসরণ কর; বেহেস্ত্ মিলবে।

মার্কস কিন্তু এই ধর্ম বস্তুটার উপরই আঘাত হানলেন। চব্বিশ বছর বয়সে ডিমোক্রিটাস ও এপিকিউরাসের দর্শনের উপর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে- ‘থিসিস’ তিনি উপস্থাপিত করেছিলেন, তার ভূমিকাতে ঈসকিলাসের প্রমিথিউসের সঙ্গে তিনি কন্ঠ মেলালেন- প্রকৃতই সকল দেবতা আমার ঘৃণার পাত্র। তিনি ঘোষণা করলেন : মানুষের প্রকৃত সত্তা বাস্তব রূপ পাচ্ছে না বলে সেই সত্তার কল্পনায় রূপায়ন ঘটছে ধর্মে। ধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ফলে, অপর যে-জগতের আত্মিক সুবাস হল ধর্ম, সেই জগতের বিরুদ্ধেই সংগ্রামের মাধ্যম মাত্র। ধর্মীয় যাতনা প্রকৃত যাতনার প্রকাশ এবং সেই বাস্তব যাতনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ধর্ম হল নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাস… জনতার আফিম। ধর্মের মধ্যে আনন্দের মোহ বিনাশ করবার প্রয়োজন রয়েছে, প্রকৃত আনন্দ যাতে সর্ব-লভ্য হয়। যে-পরিবেশ বজায় রাখবার জন্য মোহের প্রয়োজন হয় তার উচ্ছেদের জন্যই মায়াজাল ছিন্ন করা আবশ্যক।

ধর্ম যে সর্বদাই দৈনন্দিন জীবনের ক্রিয়াকলাপ, নীতিবোধ, মূল্যবোধকে ঠেকা দিয়ে এসেছে, এ আজকের সমাজতত্ত্বের যে-কোনো পাঠ্যপুস্তকেই স্বীকৃত। মার্কসবাদীর কাছে ধর্ম গেল; কিন্তু তাহলে রইল কী?
মার্কস বললেন: ধর্মের সমালোচনা এই বলে শেষ হচ্ছে যে সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। সেই জন্য চরম দায়িত্ব হল সমূলে উৎপাটিত ক’রে ফেলা সেই সমস্ত সম্পর্ক যাতে মানুষ অবনত, অবহেলিত, ঘৃণিত দাসসত্তায় পরিণত হচ্ছে।

মার্কসবাদীর কাছে তাহলে পরকাল আসল সত্য নয়; এই পৃথিবী, এই মানবজীবন, আসল সত্য। এই জীবনের মূল কর্তব্য হল যে-সমাজব্যবস্থা মানুষের মনুষ্যত্বকে বিনাশ করছে সেই সমাজব্যবস্থাকে মূলগতভাবে পরিবর্তিত করা, যাতে মানুষ তার প্রকৃত সত্তা অর্জন করতে পারে। কিন্তু এই মনুষ্যত্বর বিনাশ ঘটাচ্ছে কে বা কারা? এদের অবলোপই বা ঘটবে কোন পন্থায়?

তার জবাব মার্কস-এঙ্গেলস দিয়েছেন : মানুষের অদ্যাবধি লিখিত ইতিহাস হল তীব্র তীক্ষ্ন শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস। কর্ম-বিভাজনের ভিতর দিয়ে এসেছে উদ্বৃত্ত উৎপাদন; উদ্বৃত্তকে অসমানরূপে আত্মসাতের মারফতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন শ্রেণী; উৎপাদনের উপাদান কিছু অংশের করায়ত্ত থাকার মারফৎ শ্রম-সৃষ্ট বস্তু শ্রমিকের শোষণের উপাদানে পরিণত হয়েছে। সামগ্রিক উৎপাদনসম্পর্ক হল ভিত্তি, যার উপরে গড়ে ওঠে সামাজিক, রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং মানুষের ভাবজগৎ। সুতরাং তার সত্য, ন্যায়, নীতি সম্পর্কে ধারণাও মূলত নির্ধারিত হবে তার শ্রেণীগত অবস্থানের উপর।

প্রশ্ন উঠতে পারে : শ্রেণীভেদে সত্যেরও রূপভেদ হয় কেমনভাবে? মনুষ্যনিরপেক্ষ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ফলাফল শ্রেণীনিরপেক্ষ হতে পারে, যদি ব্যবহারিক প্রয়োগ স্বাতন্ত্র বিষয়; কিন্তু যেখানেই মানুষের ব্যক্তিচিন্তা, ব্যক্তিস্বার্থ জড়িত আছে, যেখানেই ব্যক্তিমানস প্রতিফলিত হচ্ছে, সে-সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই শ্রেণীরূপ ধারণ করবে। বস্তুত ন্যায়নীতি, শুভাশুভ সম্পর্কে মানুষের চেতনা এতো পৃথক যে এ-সম্বন্ধে আপেক্ষিকতার স্বীকৃতির জন্য মার্কসপন্থী হতে হয় না৮। এঙ্গেলস খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন : জাতিগত পার্থক্য ও ইতিহাসের উপরে নীতির জগতে অপরিবর্তনীয় আইনসমূহ আছে এই অজুহাতে চিরন্তন, চরম ও চিরকালীন অপরিবর্তনীয় নীতির বিধান আমাদের উপর চাপিয়ে দেবার সকল চেষ্টাকে আমরা অগ্রাহ্য করি।… সমাজও যেমন এতকাল শ্রেণীদ্বন্দ্বের মারফৎ এগিয়েছে, নৈতিক চেতনাও তেমনি বরাবরই হয়ে এসেছে শ্রেণীগত নীতিবোধ।

তাহলে মার্কসবাদী কোন নীতিবোধকে সচেতনভাবে গ্রহণ করবে?

স্বভাবতই অভিজাগতিক কোনো চেতনার আশ্রয় যখন নেই, শ্রেণী-নিরপেক্ষ মানবিকতা যখন অবান্তর, তখন তাকে গ্রহণ করতে হবে সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণীর নীতিবোধকে। তা গ্রহণ করবে এই জন্যই যে সমস্ত মানুষের মুক্তির অগ্রগামী পথিক হল সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণী। মার্কস ও এঙ্গেলস বলছেন: বর্তমান সমাজের নিম্নতম স্তরে অবস্থিত সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণী, তার উপরে চেপে বসে থাকা প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থাকে ছুঁড়ে ফেলে না দিয়ে নড়তে পারে না, নিজেকে টেনে তুলতে পারে না। আরও বলেছেন: এ শ্রেণী নিজেকে মুক্ত করতে পারে না, সমাজের অন্য সমস্ত ক্ষেত্রের বন্ধন থেকে মুক্তি না নিয়ে এবং তার মধ্য দিয়ে আর সকল ক্ষেত্রকে বন্ধনমুক্ত না ক’রে…। বলেছেন : শ্রমিকের মুক্তির মধ্যে নিহিত আছে বিশ্বজনীন মানবমুক্তি…।

এখন শ্রমিকশ্রেণীর নীতিবোধ বা দৃষ্টিভঙ্গি বলতে কী বুঝি?

সমস্যা কিন্তু একটা আছে। বর্তমানে শ্রমিককে শোষণব্যবস্থা অনিবার্যভাবেই বিপ্লবী চেতনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে; কিন্তু এই শ্রমিক শোষণের ফলস্বরূপই জ্ঞান ও বিজ্ঞানে, শিল্প ও সংস্কৃতিতে শ্রেষ্ঠ অবদানের সঙ্গে অপরিচিত থাকছে। অশিক্ষা ও বঞ্চনার প্রভাবে তার উপরও ধর্মীয়, গোষ্ঠীগত, ও জাতিগত সংকীর্ণতা এবং অর্থনৈতিক সুবিধাবাদ কাজ ক’রে থাকে। সুতরাং শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে প্রকাশমান মনোভাবমাত্রেই মানবমুক্তির নিয়ামক চেতনা বলা কি যায়?

এর জবাব দিয়েছেন মার্কস : চিন্তা রূপায়িত হবার চেষ্টা করবে এই যথেষ্ট নয়, বাস্তবকেও চেতনার জগতে পৌঁছাবার চেষ্টা করতে হবে।… দর্শন যেমন তার শরীরী অস্ত্র পায় সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণীতে, সর্বহারাও তার চৈতন্যজগতের অস্ত্র খুঁজে পায় দর্শনে১৩। আর লেনিন বলেছেন : বুর্জোয়া যুগের শ্রেষ্ঠ মূল্যবান সৃষ্টি গুলিতে অস্বীকার করা তো দূরের কথা, দু হাজার বছরেরও বেশি কাল জুড়ে মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতির বিকাশের মধ্যে যা কিছু ভালো তাকেই আত্মীকরণ করেছে ও নবরূপে গড়েছে বলেই মার্কসবাদ বিপ্লবী সর্বহারা শ্রেণীর মতাদর্শ হিসেবে ঐতিহাসিক তাৎপর্য অর্জন করেছে।

অর্থাৎ, বিশ্ব-সংস্কৃতির সেরা ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী যে-শ্রমিকশ্রেণী তার সারিতে দাঁড়াতে হবে : শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামের সঙ্গে মানবমুক্তির দর্শনের সংযোগ ঘটাতে হবে মার্কসবাদীকে। জীবনের সর্বত্র এই চেতনাকে প্রতিফলিত করতে হবে নিরন্তর। শুধু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে লড়াই করা নয়, বিশ্বসংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ অবদানকে আত্মস্থ করতে হবে ও শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে তাকে সঞ্চারিত করতে হবে।

‘লড়াই’ শব্দে অনেকের দ্বিধা হতে পারে; মনে হতে পারে, চিন্তা, চেতনা, মনোভাব গ্রহণ করা কি যথেষ্ট নয়? শ্রমিকশ্রেণীর সঙ্গে একাত্ম বোধ করাই কি পর্যাপ্ত নয়? কিন্তু মনে রাখতে হবে, মানুষের চেতনার পথ হল কর্মের পথ, অভিজ্ঞতার পথ। শ্রমিকশ্রেণীর সঙ্গে একাত্ম হওয়া মানে তার মুক্তির জন্য, অর্থাৎ মানবমুক্তির জন্য সচেষ্ট হওয়া। সংগ্রাম ছাড়া তো মুক্তি আসে না। মার্কস বললেন : দার্শনিকরা নানাভাবে দুনিয়াটার ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন; আসল কথা হল একে বদলানো১। তাঁর মেয়েদের সঙ্গে খেলারমাধ্যমে মার্কসের স্বীকারোক্তির কিয়দংশ এখানে হাজির করছি:

সুখ বলতে আপনি কি বোঝেন? লড়াই করা।
আপনার প্রিয় নায়ক কে? স্পার্টাকাস, কেপলার।
আপনার কাছে প্রিয় বাণীটি কি? মানব-সম্পর্কিত কোনো-কিছুই আমার পর নয়।
আপনার প্রিয় মূলনীতিটি কি? সব কিছুকেই সন্দেহ দিয়ে পরখ করা।

লক্ষ্য করার বিষয় মানবপ্রেমিক কার্ল মার্কস সংশয়ের সঙ্গে সংগ্রাম ক’রে সন্দেহ উত্তরণের মধ্যেই সত্যে উপনীত হবার পথ বেছে নিয়েছিলেন; সংগ্রামেই তাঁর সুখ, তা সমাজ-জীবনকে পরিবর্তনের জন্যই হোক আর চেতনার পরিবর্তনের জন্যই হোক। আর নায়ক হিসাবে বেছে নিয়েছেন এমন দু জন লোককে, যার একজন স্পার্টাকাস, রোমের বৃহত্তম ও দীর্ঘকালব্যাপী দাস-বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং মৃত্যুবরণ করেছিলেন; অপরজন কেপলার, বিজ্ঞানের যে- তথ্যকে সত্য বলে বুঝিয়েছিলেন তাকে অস্বীকার করতে রাজী হন নি, খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের চরম নিপীড়ন সত্ত্বেও। এই সূত্রে স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে মার্কস অন্যত্র বলেছেন: দর্শনের দিনপঞ্জিতে প্রমিথিউসের নাম থাকবে শ্রেষ্ঠ সন্ত ও শহীদ হিসাবে। এ সেই গ্রীক পুরানের প্রমিথিউস। দেবতারা আলো ও আগুন থেকে মানুষকে বঞ্চিত ক’রে রেখেছিলেন : প্রমিথিউস সূর্যে কাছ থেকে সেই আগুন চুরি ক’রে নিয়ে এসে মানুষের অন্ধকার দূর করেন। কঠিন শাস্তি দেন দেবরাজ তাঁকে: পাথরের সঙ্গে শেকলে বাঁধা প্রমিথিউসের দেহ ঠুকরে ঠুকরে খেত প্রতিদিন এক শকুনি। তিরিশ হাজার বছর চলবার কথা এ-শাস্তির। মানবসন্তান হারকিউলিস এই শকুনিকে হত্যা ক’রে প্রমিথিউসকে মুক্ত করেন তিরিশ বছর পর।

প্রতিটি নায়কের চরিত্রে একটা বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে: প্রত্যেকেই মানুষের সেরা পাওনা, তার জীবন, স্বেচ্ছায় উৎসর্গ করছে সত্যের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য, মানবমুক্তির জন্য।

দার্শনিক প্রশ্ন তুলতে পারেন: মার্কসবাদী ঈশ্বর মানে না, ধর্ম মানে না, অতীন্দ্রিয় জগৎকে স্বীকার করে না। মূঢ় ভোগবাদী তারা, স্থূল পার্থিব জান্তব আমোদ-আহ্লাদে নিজেদের ব্যাপৃত রাখার ঊর্ধ্বে ওঠার ক্ষমতা তাদের কোথায়?

এ-পর্যন্ত যে-সংগ্রামী জীবনের কথা বলা হল, তা কি ভোগবাদীর জীবনের বর্ণনা? উপরন্তু মার্কস বলছেন: সচেতন জীবন-সাধনাই মানুষকে জান্তব জীবন থেকে স্বতন্ত্র ক’রে রেখেছে। মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখ, দুনিয়ার সঙ্গে তার মানবিক সম্পর্ক স্থাপন করতে দাও; তখনই ভালোবাসার বদলে মিলবে ভালোবাস, বিশ্বাসের বদলে বিশ্বাস। টাক দিয়ে সমস্ত মানব-সম্পর্কের মূল্যায়ন সম্পর্কে মার্কস ও এঙ্গেলস তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছেন ‘সাম্যবাদী ইস্তাহারে’র ছত্রে ছত্রে।

নীতিবাগীশগণ এখনও ধিক্কার দিয়ে উঠতে পারেন: মার্কসবাদী-মানুষে মানুষে সংঘাত সৃষ্টি করতে চায়, তারা সঙ্ঘর্ষে বিশ্বাস করে, মিলনে নয়, প্রেমে নয়।

মার্কসবাদী জবাব দেবেন: মিথ্যা কথা। মার্কস বা তাঁর কোনো অনুচর শ্রেণী এ-শ্রেণীসংগ্রাম সৃষ্টি করেন নি। অর্থনৈতিক বিকাশের নিয়মে শ্রেণীর উদ্ভব; পরস্পরবিরোধী শ্রেণীর স্বার্থের সংঘাতের পরিণতি শ্রেণীসংগ্রাম। মার্কস জন্মাবার কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই শ্রেণীসংগ্রাম চলে আসবার সাক্ষ্য ইতিহাস বহন করছে। আমরা চাই যে-অবস্থা শ্রেষীশোষণ ও শ্রেণীসংগ্রাম বজায় রাখছে, সেই অবস্থারই অবসান ঘটানো। সেই অবসানের জন্যই চাই বিপ্লব।

এবার দার্শনিক সোল্লাসে বলে বসতে পারেন : এই তো মার্কসবাদীদের দোষ। লক্ষে পৌঁছবার জন্য পন্থা সম্পর্কে কোনোরকম বিচার করতে তারা নারাজ। তারা এটা বোঝে না যে অন্যায় পন্থা গ্রহণ করলে তা লক্ষবস্তুকেও বিকৃত করে। কৌটিল্য ও মেকিয়াভেলি তাদের গুরু। অসৎ, অনৃত, হিংসাত্মক কার্যকলাপের মারফৎ। বিনামূল্যে মহৎ লভ্য অর্জন করা যায় না, তা অবাস্তব।

জবাবে মার্কসবাদী বলবেন: কোনো পন্থার রূপ যতো মনোরমই হোক না কেন, তা যদি লক্ষে নিয়ে না যায়, তবে সে মনোহর গোলকধাঁধা তাঁদের কাছে পরিত্যাজ্য। বস্তুত, পন্থার সভ্যতা নিয়ে বিতর্ক অবান্তর। সেই পন্থাই গ্রহণীয় যা লক্ষে পৌঁছাতে সক্ষম হবে, সবচেয়ে কম বিলম্বে, সব চেয়ে কম ক্ষয়ক্ষতির মারফৎ। বিনামূল্যে মহৎ লভ্য অর্জন করা যায় না।

তবু মনে রাখতে হবে, এমন কতকগুলো অভ্যাস গজিয়ে না যায় যা লক্ষে উপনীত হবার সময়ে যতো প্রয়োজনীয়ই হোক না কেন, পরবর্তী পর্যায়ে তা অবান্তর ও হানিকর। যুদ্ধের সময় সৈনিক অপরপক্ষের হত্যা ও ধ্বংসের জন্য প্রশংসিত ও পুরষ্কৃত হয়; যুদ্ধান্তে হত্যা হত্যাই, প্রাপ্য শাস্তি। অনুরূপ সমস্যা বিপ্লবের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। সাধারণ নির্বাচনে জাল ভোট সংগঠিত করলে, দলীয় নির্বাচনেও জালিয়াতির অভ্যাসটা সংক্রমিত হতে পারে। ডাকাতি ক’রে যে-সব স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী দল অর্থসংগ্রহ করেছে, সেইসব দল ভাঙবার সময়ে অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ অন্যতম প্রধাম হিসাবে দেখা দিয়েছে।

আর একটি বিষয় মনে রাখতে হবে: শ্রমিকশ্রেণী অন্যান্য সমস্ত নিপীড়িত শ্রেণীর নেতা। শ্রমিকশ্রেণীর পুরোধা ও মুখপাত্রের কাজের দিকে সমস্ত মানুষই তাকিয়ে রয়েছে- শুধু ছিদ্রান্বষেী শত্রুপক্ষই নয়, সম্ভাব্য মিত্রপক্ষও- অনেকখানি আশা নিয়ে, ভরসা নিয়ে। সুতরাং মার্কসবাদীর আচরণে এমন কোনো-কিছু প্রকাশ পাওয়া ‘ন্যায্য’ হবে না, যাতে শ্রমিকশ্রেণীর নিজের আভ্যন্তরীণ ঐক্য বা আন্দোলনের পরবর্তী ধাপের বা পর্যায়ে অন্যান্য মিত্রশ্রেণীর সঙ্গে মৈত্রী ব্যাহত হতে পারে।

উপরোক্ত প্রথম বিষয়টি সম্পর্কে বিশদতর ব্যাখ্যা সূত্রে বলা যায় যে সোভিয়েৎ ইউনিয়নে স্তালিনÑশাসনে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের উপরেি যে-সন্ত্রাশ বিস্তারিত হয়েছিল তাকে শুধুু ব্যক্তিপূজার পরিণতি বলা যথেষ্ট নয়। সমাজতন্ত্র গঠনের সাফল্যে ব্যক্তিপূজা দৃঢ়ভিত্তি হতে পেরেছিল, এ ব্যাখ্যাও আশ্বাস দেয় না। কর্মে সাফল্য লাভ করার প্রয়োজনে পার্টি অভ্যন্তরীণ লৌহদৃঢ় শৃঙ্খলা নিশ্চয়ই প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের বিরোধিতা করার সুযোগ থাকবে না কেন? সফল নেতা যখন ব্যক্তিগত স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করবার জন্য সন্ত্রাশ সৃষ্টি করছেন, তখন তাঁকে ঠেকাবার ব্যবস্থা থাকবে না কেন?

অথবা, সত্যই নেতৃত্বের বিরোধিতার অধিকার মার্কসবাদীকে অর্জন করতে হবে, প্রমিথিউসের মূল্য দিয়ে? পোল্যাণ্ড থেকে সোবিয়েৎ ইউনিয়ন পর্যন্ত বহু অসম্মানিত শাস্ত্রিপাপ্ত সাম্যবাদী নেতারই তো পুনর্বাসন ঘটলো। পোল্যাণ্ডের প্রধানমন্ত্রী গোমূলকাকেও তো সাম্যবাদী শাসনাধীনে দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছে। আসলে দ্বন্দ্ব তো শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্বের সাথে সাথেই শেষ হয় না; সমাজতান্ত্রিক গঠনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গেও নয়; এ দ্বন্দ্বে সরকারবিরোধী পক্ষ, প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের বিরোধী পক্ষই যে সবসময়ে সাম্রাজ্যবাদ ও বুর্জোয়াশ্রেণীস্বার্থের প্রতিভূ, তা নয়। সর্বদাই তারাই ঠিক বলছে, তাও নয়। মার্কসবাদ ধর্শ নয়। ঝাণ্ডার রং দেখে, মার্কস-লেনিনের উদ্ধৃতি দেখে, মার্কসবাদীর যাচাই হবে না। বিশেষ ঐতিহাসিক পটভূমিকায় তার কাজ দিয়েই তার চরিত্র বিচার হবে।

মার্কসের জন্মের দেড়শো বছর পরে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশে সমাজতন্ত্রের এতখানি সাফল্যের পরেও, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন আজ দ্বিধাবিভক্ত। ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট আন্দোলনও ত্রিধাবিভক্ত; কমিউনিস্ট নাম গ্রহণ না করেও মার্কসও লেনিনের প্রতি বিশ্বস্ততা ঘোষণা করে অল্পবিস্তর প্রভাবশালী এমন একাধিক দল বিদ্যমান। পরস্পরের প্রতি গালিমন্দ নিক্ষেপ করা স্বাভাবিক হলেও, ইতিহাসের চোখে তাৎপর্যহীন। যে-কোনো নামেই উপস্থিত থাক না কেন, এ-অবস্থাটা প্রতিটি মার্কসবাদীর কাছে একটা চ্যালেঞ্জ।

শ্রমিকশ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে, শ্রমিকশ্রেণী ও মার্কসবাদের একত্ব স্থাপন করতে হবে, ভাবে, বাক্যে ও কর্মে সর্বহারা-বিপ্লবী রূপটি অর্জন করতে হবে ও প্রকাশ করতে হবে। মার্কসবাদের শক্তির বিকাশ ঘটবে এই মার্কসবাদীদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে, জয় তারই, যে যত শীঘ্র প্রকৃত মার্কসবাদী রূপকে প্রকাশ করতে পারে। অবশ্য বিনাশ হওয়াও সম্ভব, যদি একচেটিয়া পুঁজিপতির মনোভাবই গ্রাস ক’রে বসে, যদি অপরের বিনাশের মধ্যে নিজের স্ফীতির মোহ প্রাধান্য পায়।

বিপদ তো এই। কোনো সোজা ‘ফর্মূলা’ পাচ্ছি না। মার্কসবাদ আমাকে প্রকৃত মার্কসবাদী, অর্থাৎ পরিপূর্ণ মানুষ হতে আহবান করছে। আমার খণ্ডিত সত্তা নিয়ে আমি সচেতন যে আমি তা নই। কিন্তু মার্কসবাদই আমাকে চলমান বিকাশমান জীবন সম্বন্ধে আস্থা এনে দিয়েছে। মার্কস জন্মাবার দেড়শো বছর পরে সমস্ত মার্কসবাদী এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার শক্তি কি রাখে না?

নির্দেশিকা

1.Abu Syed Ayub : Marxism, History of Philosopy : Eastern and western. vol. II, p. 394|

2. Marx, k : Capital, vol. I. Afterward to the second German edition, Moscow, p. 20|

3. ‘ফিলিস্টাইন’-Philister থেকে উদ্ভুত; আটপৌরে, হেটুরে, অমার্জিত ব্যক্তি।

4.Marx, k and Engles. F : On Religion, Moscow, p. 13|

5.Marx, k : “Contribution to Critique of Hegel’s Philosophy of Right”, Ibid., pp. 37-38 |

6.Davis, K : Human Society, p. 74|

7.Marx, K : “Contrubution to Critique of Hegel’s Philosophy of Right’, On Religion,p. 45|

8.Kallen, H. M : On “Morals’, Encyclopedia of Social Sciences, vols, IX and X, pp. 643-645|

9.Engels, F : Anti-Duhring, Moscow, p. 132|

10.Marx, K and Engels, F : Manifesto of the communipts of 1844, Moscow, p. 64|

11.Marx, K : “Contribution to Critique of Hegel’s Philosophy of Right’, On Religion, p. 51|

12.Marx, K : Economic and philosophic Manuscripts of 1844, Moscow, p. 82|

13.Marx, K : “Contribution to Critique of Hegel’s Philosophy of Right’, On Religion, P. 51|

14.Lenin, V. I . On Culure and Cultiural Revolution, Moscow, p. 153|

15.Marx, K : “Theses on Feuerbach’, On Religion, p. 64|

16.Remiscences of Marx and Engels, Moscow, p. 266|

17.Marx, K : On Religion, p. 14|

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ