‘বৌদ্ধদের পরকাল’ নিয়ে লিখেছেন ধনিরাম বড়ুয়া। বইটি প্রকাশ করেছে, তরুণ প্রকাশক রহিম রানা। তিনি জাগতিক প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী। ভিন্ন ধরনের বই পাঠকমহলে নিয়ে আসার যে প্রচেষ্টা রয়েছে, সেটি এই বইটি দেখলেই বোঝা যায়। ছোট বই। মাত্র ৭৮ পৃষ্ঠার।

মানুষ মরে যায়, লাশটি শুকনো কাঠের মতো পড়ে থাকে। যে মানুষটি সারাজীবন চলাফেরা করেছে, হাসিকান্না করেছে, কথাবার্তা বলেছে- সে মানুষটির আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। সবাই মৃত মানুষ বলে থাকে। কিন্তু মৃত মানুষের কোন বস্তুটি পরলোকে যায়! এ নিয়ে নানান মত রয়েছে, যা এ বইটিতে কিছু পাওয়া যাবে।

বুদ্ধ পরকাল সম্বন্ধে অনেক কিছুই বলে গেছেন, পরকাল নির্ভর করে মানুষের ইহ জন্মের কর্মের উপর । মৃত্যুর পর মানুষ ৩১ লোকভূমির যে কোনো একটিতে গমন করে। এই ৩১ লোকভূমি হচ্ছে ৪ প্রকার অপায় : তীর্যক (পশু-পাখি কুল), প্রেতলোক (প্রেত-পেত্নী), অসুর (অনাচারী দেবকুল), নরক (নিরয়)। ৭ প্রকার স্বর্গ : মনুষ্যলোক, চতুর্মহারাজিক স্বর্গ, তাবতিংশ স্বর্গ, যাম স্বর্গ, তুষিত স্বর্গ, নির্মানরতি স্বর্গ, পরনির্মিত বসবতি স্বর্গ। রুপব্রম্মভূমি (১৬ প্রকার) = ১৬ প্রকার রুপব্রম্মভূমি । অরুপব্রম্মভূমি (৪ প্রকার) = ৪ প্রকার অরুপব্রম্মভূমি । মোট ৩১ প্রকার । এই ৩১ প্রকার লোকভূমির উপরে সর্বশেষ স্তর হচ্ছে নির্বাণ (পরম মুক্তি) যেমন : ইহজন্মে মানুষ যদি মাতৃহত্যা, পিতৃহত্যা, গুরুজনের রক্তপাত ঘটায় তাহলে মৃত্যুর পর সেই মানুষ চতুর অপায়ে (তীর্যক, প্রেতলোক, অসুর, নরক) জন্মগ্রহণ করে, আর ইহজন্মে মানুষ যদি ভালো কাজ করে তাহলে মৃত্যুর পর সেই মানুষ বাকি ২৮ লোকভূতে গমন করে।

বোদ্ধদের পরকাল বইটিতে দুটি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়টি ‘পরকাল’ ও ‘নরক’ এবং দ্বিতীয় অধ্যায়টি ‘প্রথম কাম-সুগতিভূমি : মানবলোক ও স্বর্গ ও ব্রহ্মলোক। এটি খুব ক্রিটিক্যাল বিষয়। পরকাল অধ্যায়ে লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এই আত্মা মানুষ বা জীবের দেহ থেকে নির্গত হয়ে কোথায় যায়? কার কাছে যায়? কার নির্দেশে যায়? এমন অনেক প্রশ্ন আসতে পারে। আর এসবের উত্তর পাওয়াও কঠিন। বৌদ্ধধর্র্মে কিন্তু আত্মা অস্বীকৃত। বস্তু এক হলেও ‘নাম’ ভিন্ন।…’ এভাবেই ঘটনাকে তুলে এনেছেন লেখক। মানুষ জানার বা বোঝার শেষ নেই। তুমুল জানার আগ্রহ থেকে বইটি পড়া শুরু করতে পারেন।

গৌতম বুদ্ধ ছিলেন প্রাচীন ভারতের এক ধর্মগুরু এবং তাঁর দ্বারা প্রচারিত ধর্ম বিশ্বাস ও জীবন দর্শনকে বৌদ্ধ ধর্ম বলা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গৌতম বুদ্ধের জন্ম। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর অনুগামীরা তাঁর জীবনকথা ও শিক্ষা লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর শিক্ষাগুলি প্রথম দিকে মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। বুদ্ধের মৃত্যুর প্রায় চারশো বছর পর এগুলি লিপিবদ্ধ করা হয়।

এ বইটির বিশেষত্ব হলো, প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে মানুষের চিন্তার জগতকে নাড়া দেওয়া। লেখক তাঁর লেখকসত্তা দিয়ে এ কাজটি সক্ষমভাবেই করতে পেরেছেন।

‘এতক্ষণ পরকাল নিয়ে আলোচনা হলো। প্রশ্ন আসতে পারে পরকালের স্বায়িত্ব কতদিন বা কত বছর? কিন্তু বৌদ্ধমতে মৃত ব্যক্তিদের নির্বাণমুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই একত্রিশ লোক ভূমির ঘাটে ঘাটে কোথায় কোথায় কি অবস্থায় অনন্তকাল ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে বা বেড়াবে তা মানুষের সাধারণ জ্ঞানের অতীত। তাই তাদের যদি কোনোক্রমে প্রেতলোকে জন্ম হয় এই ভয়…।’

খুব সহজ-সরলভাবে বললে, পরকাল একটি বিরাট রহস্য। যে রহস্য উদ্ঘাটন করতে হলে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ধ্যান করতে হবে, ভাবতে সৃষ্টির আদি রহস্য নিয়ে। জানতে হবে হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস। সর্বসাকুল্যে এরকম একটি প্রশ্নাতুর বই পাঠকমহলের সামনে নিয়ে আসার জন্য জাগতিক প্রকাশনকে ধন্যবাদ।

বই : বৌদ্ধদের পরকাল
লেখক : ধনিরাম বড়ুয়া
প্রকাশক : জাগতিক প্রকাশন
প্রকাশকাল : ২০২১
মূল্য : ১২০

 

 

  • পর্যালোচক : লাবণী মণ্ডল, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, প্রান্তবার্তা