বিপ্লব, আন্দোলন, করোনা অথবা বিষয়বস্তু নির্ধারিত নয়

ইদানিং ফয়সাল প্রায়ই চুপচাপ থাকে। আড্ডাগুলোর অসুখ করেছে। যেখানে প্রতিনিয়ত কথার ঝাঁজে টিকে থাকা যেত না, কথার বৃষ্টি নামত; সেখানে আজকাল নিস্তব্ধতার খরা।

ফয়সালের গানের গলা ভালো। টুকটাক গায়। খেয়াল-খুশিমতো। কারো উৎসাহে কিংবা উদ্দীপনায় নয়। কেমন একগুঁয়ে। তবে রসিকতায় ভরপুর থাকে, যখন তার ভেতরে বিপ্লবী তেজ উথলে উঠে। আজকাল অবশ্য তেজে খানিক ভাটা পড়েছে।

সীমার সাথে প্রেমের শুরুতে ফয়সাল তুমুল ঝগড়া চালাত। কেউ কাউকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না! তবে সীমা বেশ আকৃষ্ট হয়েছিল, ওই ঝগড়ার সুরের কারণেই। সেই ফয়সাল হঠাৎ করে কেনই-বা চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে! এ নিয়ে সীমার ভাবনার জগত ভারী হচ্ছে।

চাকরি জগতে ঝামেলার শেষ নেই। সাংবাদিকতা করে পেট চলে না। ফয়সাল প্রায়ই এ ধরনের আফসোস করে। অথচ চিত্র ভিন্ন। ছোটখাটো সাংবাদিকতার চাকরি করেও কত চাকচিক্যে জীবন চালাচ্ছে অন্যরা; কিন্তু ফয়সাল তো ফয়সালই! তার চেতনায় ‘দালালীপনা’ নেই। যে কারণেই সব জায়গা থেকে বিতাড়িত। এসবই কী ফয়সালকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে?

গত দেড় বছরে বাইরের জগৎ বলতে খোলা ছাদ, আর ছোট্ট ব্যালকনি। পৃথিবীব্যাপী মহামারি চলছে। বিনোদন, আড্ডা, মিছিল, মিটিং সবকিছুতেই স্থবিরতা। এসব ভাবতে ভাবতে সীমা বেশ আহ্লাদী স্বরে ফয়সালকে গান গাওয়ার অনুরোধ জানাল। হয়তো পরিবেশটা একটু হাল্কা করাই উদ্দেশ্যে।

ফয়সাল টবের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা ওদের মন খারাপ কেন? পাতাগুলো নড়ছে না কেন? ঘন সবুজ রঙ এরকম ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে কেন? ফুলগুলোর উচ্ছ্বাস নেই কেন? মৌমাছির আনাগোনা কমেছে না-কি!

সীমার চোখ ছানাবড়া। হঠাৎ তার এ-কী ভীমরতি! কীসব কাব্যিক ঢঙে কথাবার্তা। আতঙ্কিত হয়ে পড়ল সে। এর মধ্যে আবার হঠাৎ করেই গলা ছেড়ে গান ধরল ফয়সাল, ‘হেই সামালো ধান হো, কাস্তেটা দাও শাণ হো/ জান কবুল আর মান কবুল, আর দেব না, আর দেব না রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো’; সলীল চৌধুরীর এই গানটি মনে করিয়ে দেয় কৃষকের বঞ্চিত জীবনের কথা, ভাগের ধান ছিনিয়ে নেওয়ার বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে ওঠা এক আন্দোলনের কথাও। ‘নাচোলের রানি’ খ্যাত ইলা মিত্র বিখ্যাত হয়ে আছেন এই তেভাগা আন্দোলনের হাল ধরার জন্য।

সীমার খুব প্রিয় গান; কিন্তু আজ তাকে গানটি নাড়া দিচ্ছে না। ফয়সালের অস্বাভাবিক আচরণ তাকে অস্থির করে তুলছে।

সিগারেট ফুঁকছে দুজনেই। ধোঁয়াগুলো কেমন নীলচে রঙ ধারণ করছে। সবকিছুতেই কেমন অস্বাভাবিকতা!
সীমা মুখ ফসকে বলল, ‘শোনো না তোমার কোনো মানসিক সমস্যা হচ্ছে কী? ডা. আপা তো আমার খুব কাছের মানুষ কথা বলব আগামীকাল!’ ফয়সালের সম্বিত ফিরে এল।

‘হুম, বলতে পার।’

হ্যাঁ! করোনাকালীন সময়ে ফয়সাল মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে তাদের একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। সীমার অ্যাভরশন হয়ে গেছে। যেটি যতটা সীমাকে আঘাত করেছে, তার চেয়েও বেশি ফয়সালকে।

ফয়সালের মনটা আজ একটু ফুরফুরে। বেশ বিপ্লবী মুডে কথাবার্তা বলার জন্য সীমাকে প্রলুব্ধ করছে। রাত সাড়ে তিনটা। এপাশ-ওপাশ করতে করতে সীমার চোখ ছোট হয়ে আসছে। এ মুহূর্তে ফয়সালের পাগলামী বাড়ছে।

‘আচ্ছা, ধরো আগামী দশ বছর পর কমিউনিস্টরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করল- তখন কী হবে!’কথাগুলো ফয়সাল সীমাকে উদ্দেশ্য করে বলল। ঘুমকাতুরে সীমা একটু বিরক্তি ভাব নিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। ডিম লাইটে সীমাকে অপূর্ব লাগছে। এমনিতেই সে শ্যামা গড়নের। আহামরি সুন্দরী নয়; কিন্তু তাকে এ মূহূর্তে ‘আগুন সুন্দরী’ লাগছে। ফয়সাল এসব ভাবছে। এদিকে ভোর প্রায়, আজান পড়ছে; কিন্তু ঘুম, সে-তো পালিয়েছে করোনাকালে!

ভোরের আকাশে মেঘ জমেছে। অন্ধকার করে আসছে। আজ ফয়সালের ঘনিষ্ঠ কমরেড জহিরের বাসায় আসার কথা। বিপ্লবী আড্ডা চলবে। জহির বেশ অভিজ্ঞ মানুষ। পুলিশি-আইনি নির্যাতন জীবনে কম সহ্য করতে হয়নি। তবুও হাড়ে-মজ্জায় কমিউনিস্ট। বিপ্লবের গান ছাড়া আর কোনো ভাবনা নেই।

জহিরের সঙ্গে ফয়সালের গল্প জমে উঠল; কিন্তু সীমার ঘোর কাটেনি…

 

  • লাবনী মণ্ডল : লেখক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, প্রান্তবার্তা

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ