বাংলাদেশের গণবিপ্লব

“যারা ভাবেন বাংলাদেশ একটি ‘মুসলমানের দেশ’ এবং যারা ভাবেন স্বাধীনতা ‘কেবল মুসলমান সংখ্যাগুরুদের’ তারা সম্পূর্ণ ভুল ভাবেন। যারা ভাবেন ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, তারাও সত্য থেকে বহুদূরে বিভ্রান্তিতে ভোগেন।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ঘটনাটি ইতিহাসে নানাভাবে লিখিত হচ্ছে। সংকীর্ণমনা তথাকথিত কিছু লেখক ও লিখেছেন। এইসকল ইতিহাসের নামে তথ্যবিকৃতির ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে।
প্রধানত তিনটি দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এসকল লেখা-

১) শেখ মুজিবর রহমান স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন।
২) ধর্মীয় দৃষ্টিকোন। বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায় লড়াই করে পাকিস্তানকে হারিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন।
৩) ভারত যুদ্ধ করে পাকিস্তানকে হারিয়ে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে।

আমি যা বলতে চাইছি, এই তিনটির কোনোটিই পূর্ণ একক সত্য নয়। প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা অর্জনের ছকে ফেলে, কার্যকারণ মিলিয়ে আমার একটি ধারণায় বদ্ধমূল। সেটিই প্রকাশ করবো। অনেকেই সহমত হবেন না । না হওয়াই স্বাভাবিক। আর যতদিন না নির্মোহ গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের গণবিপ্লবের ইতিহাস রচিত হয়, ততদিন এই ইতিহাসে- ব্যক্তিগত সংকীর্ণতা, গপ্পোকথা, গল্পগাছা, স্বার্থ ইত্যাদি দৃষ্টিভঙ্গী থাকবেই।

অন্যান্য দেশের ইতিহাসের উপাদান হিসাবেও এগুলি ছিল, গবেষকরা এদের মধ্যে থেকেই গ্রহণ বর্জন করে সত্য আবিষ্কার করেছেন। এবারে অতি সংক্ষিপ্ত আকারে আমার চিন্তাটি পেশ করি। প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে, স্বাধীনতা কার?

আগে ছিল, সম্রাট, রাজা, নবাব, সুলতান অর্থাৎ শাসকের স্বাধীনতা। যেমন খুশি, দেশ শাসন করবে সেই স্বাধীনতা। কথায় বলি বাঙলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। নবাব স্বাধীন, প্রজারা কিন্তু নয়। তারপর এলো ইংরেজ শাসকের স্বাধীনতা। তারা যেমন খুশি আইন কানুন করবে, দেশ চালাবে, শাসকই শেষ কথা বলবে।
আরেক রকম স্বাধীনতা, ওয়াশিংটন বললেন, দেশের মানুষের মধ্যে থেকেই শাসক হবে। অর্থাৎ বিদেশী শাসন মুক্ত আমেরিকা চাই।

আরেক রকম স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ হল রাজার বিরুদ্ধে রাশিয়া, চীন আর কিউবাতে। এরা বললেন জনগনের স্বাধীনতা, শাসকের নয়; জনগণই শেষ কথা। এরা একে বললেন বিপ্লব।

দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতা অর্জন ও হয়, আবার গ্রহণও হয়। ভারত-পাকিস্তান ১৯৪৭ এ স্বাধীনতা-প্রাপ্ত হল। নথীবদ্ধ হল ‘ক্ষমতা-হস্তান্তর’।

বাংলাদেশ কিন্তু স্বাধীনতা অর্জন করল ১৯৭১ সালে। লক্ষ্য করার বিষয়, বিদেশী বা বিধর্মীদের কাছ থেকে নয়। মুক্তি অর্জন করল ‘ধর্মীয় বিশ্বাসের’ সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীর শাসনব্যবস্থা থেকে। আর অর্জনের পদ্ধতি হল আপামর জনসাধারণের প্রত্যক্ষ যুদ্ধের মাধ্যমে। সহমর্মী ভারত সেই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সহায়তা করল, সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির পরোক্ষ সহায়তায়।

আরো লক্ষ্য করার বিষয়, রাজতান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদী আর ইসলামী শাসনতন্ত্রের সকল দেশ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে। শত্রুপক্ষে। লড়াইটা ছিল পাকিস্তানী ইসলামী ধর্মবিশ্বাসের সংকীর্ণ শাসন ব্যবস্থা থেকে বাঙালি আত্মপরিচিতির মুক্তির স্বাধীনতা। আর আপামর জনগণের প্রত্যক্ষ যোগদানে এই যুদ্ধ বস্তুতপক্ষে ছিল একটি ‘বিপ্লব’।

প্রতিটি বিপ্লবের নির্মাণের পেছনে থাকে একটি আদর্শিক ভাবনার শক্তি, যা একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠিকে একসূত্রে বেঁধে রাখে, অনুপ্রেরণা জোগায় এবং সেই অনুযায়ী লক্ষ্য পূরণে উদবুদ্ধ করে রাখে। সেটি অনেকটা মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত বীজমন্ত্রের মত ক্রিয়াশীল থাকে । যেমন ফরাসী বিপ্লবের পিছনে ছিল দার্শনিক ভলতেয়ারের এক বোধ বা জ্ঞান । ভলতেয়ার যদিও ঈশ্বর বিশ্বাসী ছিলেন, তবুও চলতি তত্ত্বের বাইরে এসে এমন একটি সত্যজ্ঞানের কথা বললেন যা শোষণের শৃঙ্খল্মুক্তির বীজ মন্ত্রের মত শক্তি জোগালো জনসাধারনের মধ্যে।

প্রচলিত ধারণাই ‘ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, তিনিই পার্থিব এবং অপার্থিব সকল বিষয়ের নিয়ন্ত্রক, তাঁর ইচ্ছাতেই সব ঘটে । দারিদ্রও পূর্ব নির্ধারিত, এবং তা একমাত্র ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই দুঃখ কষ্ট দারিদ্র্য নিয়ন্ত্রিত হয়। ‘ভলতেয়ার ঈশ্বরের সৃষ্টি, সর্বশক্তিমান ইত্যাদি মেনেও বললেন ছোট্ট একটি কথা। ‘ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছেন তাঁর অনেক ক্ষমতাও দিয়েছেন, শক্তির কিছু অংশের উত্তরাধিকার তাঁর এই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি । মানুষকে পরিস্থিতি পরিবর্তনের শক্তিও দান করেছেন অন্যান্য অনেক ক্ষমতার মত।’ এইটুকু পার্থক্য, ইহজগতে সকল কিছুই অপরিবর্তনীয় নয় ইচ্ছা করলে পরিবর্তন মানুষ তার প্রচেষ্টায় দারিদ্র্যেরও পরিবর্তন করতে পারে । এই আত্মবিশ্বাসটুকুই শৃঙ্খল মোচনের বীজমন্ত্রের মত কাজ করল, যার পরিণতি ফরাসী বিপ্লব।

রুশ বিপ্লবের বীজমন্ত্র হিসাবে কাজ করলো মার্ক্সীয় তত্ত্ব যা শুরু হয়েছিল জারতন্ত্রের উচ্ছেদের আহ্বানে সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে । চীন বিপ্লবের অগ্রবর্তী বাহিনী কৃষক শ্রমিক সর্বহারার একত্রিত যোগদানে। কিউবাতে সশস্ত্র প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে। সমস্ত ক্ষেত্রেই একটি বিশ্বাস বা বস্তুবাদী আদর্শের মন্ত্রে

বিশ্বে বহু যুদ্ধ হয়েছে। একগোষ্ঠীর সাথে অন্য গোষ্ঠীর । ধর্মযুদ্ধ, ক্রুসেড, জেহাদ সবই নির্ভর করেছে পরলোকের কন্সেপ্টের ওপর বিশ্বাস করিয়ে আসলে শাসন শোষণ করার অধিকার, প্রভুত্বের অধিকার সম্পদের অধিকার। ক্ষমতালাভ ও ভোগের অধিকার লাভের দার্শনিক তত্ত্ব ধর্বিশ্বাসই ছিল বীজমত্র যার দ্বারা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে, অনুপ্রাণীত করে কাজে লাগানো যায়। সেই সব হানাহানিতে দুই পক্ষ হল ভিন্ন ভিন্ন পারলৌকিক বিশ্বস্তের দল।

শাসন ক্ষমতার উদ্দেশ্য সাধনে দুটি বিশ্বযুদ্ধও হয়ে গেল । সেখানে মুখোমুখী যুদ্ধ করানো হল বেতন ভুক সৈন্যদের দিয়ে; ‘হয় মারো নয় মর’ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে । হিটলার জাতীয়তাবাদের স্লোগানের আশ্রয় নিয়েছিল নিজে বিশ্বনিয়ন্ত্রক বা বিশ্বপ্রভুত্বের স্বপ্নে । তার সৈণ্যসামন্ত আর সমর্থকের মধ্যে জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে । দাবী ছিল তারাই খাঁটি আর্য রক্তের বাহক, আর সবাই মিশ্র রক্তের সংকর জাতি সুতরাং বিশ্বের উন্নয়নে তারাই প্রথম হকদার। স্বৈরতন্ত্রের শাসন ব্যবস্থা কায়েমের জন্য বিশ্বময় এই হত্যাযজ্ঞ। এগুলি মূলত যুদ্ধ।

কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ এসবের কোনটার সঙ্গেই হুবহু মেলেনা। ১৯৭১ এর যুদ্ধ বস্তুতপক্ষে একটি বিপ্লব। স্বাধীনতা প্রাপ্তির কথা উঠলে তো বলাই যায় স্বাধীনতা তো পাওয়াই হয়ে গিয়েছিল ১৯৪৭ সালেই । কাজেই এটিকে স্বাধীনতা যুদ্ধও বলা বোধ হয় সমীচিন নয়। এখানে এক সৈন্যদলের বিরুদ্ধে আরেক সৈন্যদলের যুদ্ধও নয়। একদিকে সৈন্যদল অন্যদিকে জনসাধারণ মুখোমুখি হয়ে লড়াই শাসকের বিরুদ্ধে । এ ধর্মযুদ্ধও নয় । ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে আপোষ মূলক অর্জন তো ১৯৪৭ সালেই হয়ে গেছে। এই লড়াই বরঞ্চ এক এমন মুক্তির লড়াই যা একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর মুক্তির জন্য । এটি ছিল বস্তুতপক্ষে ভাষা ও সংস্কৃতির সৃষ্টি একটি বিশেষ স্বতন্ত্র জাতির ভাষাসংস্কৃতির ওপর প্রভুত্ব ও বিনাশের বিরুদ্ধে মুক্তির জন্য বিপ্লব। এই বিপ্লবের বীজমন্ত্র ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ।

নানা দেশে জাতির পরিচিতির কয়েকটি সংজ্ঞা প্রচলনের রীতি । যেমন ভারত ভাষা ও সংস্কৃতিতে বিভিন্ন বৈচিত্র থাকা সত্ত্বেও বহু প্রাচীন কাল থেকেই এই বইচিত্র একটি মূল ধারায় গ্রথিত থাকার ফলে ভারতে জাতীয়তাবাদ একটি ভৌগোলিক অবস্থানের সীমানার মধ্যে স্থিত একটি জনগোষ্ঠী ভারতীয়। পাকিস্তান সহ মধ্যপ্রাচ্যে জাতির পরিচিতি নির্ভর করে ধর্মবিশ্বাসের ওপর ।

কিন্তু বাংলাদেশে একক সাংস্কৃতিক ও ভাষার সাযুজ্যে গঠিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ। অন্যসংস্কৃতির আগ্রাসী ভূমিকা তা প্রতিহত করার জন্য একটি সশস্ত্র সংগ্রাম । এর বীজ বহু প্রাচীন, জলসিঞ্চিত হয়েছে বাংলার নবজাগরণে, সক্রিয় বিদ্রোহী হয়েছে ১৯০৫ এ লর্ড কার্জনের কুচক্রী বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে, মহাকবি রবীন্দ্রনাথের সৈণাপত্যে; এরপর এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের লালনকারীদের মধ্যে প্রধানপুরুষ অবিভক্ত বঙ্গদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আবুল কাশেম ফজলুল হকের পরিচর্যায় । রবীন্দ্রনাথের প্রয়ানের পর, বঙ্গীয় আইনসভায় এক তাৎক্ষণিক বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথকে তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নামে অভিহিত করেছিলেন একটি মাপকাঠির বিবেচনায় ।

তা হল সংস্কৃতির বহুদা ক্ষেত্রের অনায়াস বিচরণকারী বিশ্বনন্দিত কবি হিসাবে নয়, করেছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রাণপুরুষ হিসাবে । এখানেই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্পষ্ট উচ্চারণ করেছিলেন। সংস্কৃতির যে ভিত্তিভূমি ভাষা, তার স্বাতন্ত্র্যের যোগ্য মর্যাদা রক্ষার জন্য ১৯৫২ এবং ১৯৬১ সালে বুকের রক্ত ঢেলে শহীদেরা এই জাতীয়তাবাদের শক্ত শিকড়ের সন্ধান দিয়ে গেছে  এবং জাতীয়তাবাদের এই বীজমন্ত্রেই বাঙালি জাতি বিপ্লব সংঘটিত করেছিল।

আমার কাছে এটি একটি গণবিপ্লব একারনেই যে- দেশের সমস্ত জনগোষ্ঠী গণযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। এই সম্পৃক্ততার আবার দুইটা ভাগ। একদল সশস্ত্র হয়ে শাসক শক্তির মোকাবিলা করেছে, অন্যেরা অপ্রত্যক্ষভাবে এই যুদ্ধে শাসকের প্রতিপক্ষ হিসাবে আক্রান্ত হয়েছে।

এমনকি অজস্র মহিলা যারা অত্যাচারিতা, ধর্ষিতা হয়েছেন তাঁরাও প্রকৃত অর্থেই মুক্তিযোদ্ধা বিপ্লবী। অনেকে শহীদ হয়েছেন । এই অর্জনের প্রক্রিয়ায়, একটি সফল বিপ্লবের সমস্ত উপাদানই বর্তমান বলেই মনে হয়েছে। আমার মতে এই সত্যের পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশে  ‘স্বাধীনতার চেতনা’ বিচার্য।

যারা ভাবেন বাংলাদেশ একটি ‘মুসলমানের দেশ’ এবং যারা ভাবেন স্বাধীনতা ‘কেবল মুসলমান সংখ্যাগুরুদের’ তারা সম্পূর্ণ ভুল ভাবেন। যারা ভাবেন ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, তারাও সত্য থেকে বহুদূরে বিভ্রান্তিতে ভোগেন।

বাংলাদেশ বাঙালি জনগোষ্ঠীর লড়াইতে ধর্মবিশ্বাসের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে অর্জিত মুক্তির বিপ্লব। বাংলার সংস্কৃতির বীজমন্ত্রে দীক্ষিত এক জাতীয়তাবাদের সপক্ষে অর্জিত এক বিপ্লবী মুক্তি । আর এতে স্বাধীনতা অর্জন করল আপামর বাঙালি; বাঙালিই তাদের একমাত্র আইডেন্টিটি বা আত্ম পরিচিতি। জাতীয় পরিচিতি। অন্য কোন পরিচিতিতেইই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসেনি। আমার কাছে বাংলাদেশের এই বিজয়ের এটিই স্বাধীনতার চেতনা।

 

  • সুরঞ্জন দত্ত চৌধুরী, কবি ও লেখক

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ