পুরুষ হওয়ার লজ্জা থেকে বাঁচুন

কিছুদিন আগে পর্ণমোচী নামে কলকাতার একটা সিনেমা দেখি। যেখানে পর্নোগ্রাফি এবং আমাদের প্রজন্মের বিকৃত যৌন ভাবনার এক মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সিনেমাটি নিয়ে একটি বিশ্লেষনাত্মক লেখাও লিখেছিলাম৷ তার বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলো এদেশের আম জনতা! সিনেমাটিকে তো রীতিমত সফটপর্ণ আখ্যা দিলোই সঙ্গে আমাকে পাগল, উন্মাদ, নাস্তিক সহ কত বিশেষণে বিশেষায়িত করলো। সে নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নাই। তাই আজকে যখন দেশে একের পর এক ধর্ষণের খবর শুনছি তখন সে সিনেমার একটি বিষয় হুট করেই মাথায় আসলো।

সিনেমাটি যেহেতু পর্ণ ও প্রজন্মের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে সেহেতু খুব সুনিপুণভাবে সে অবক্ষয়কে দেখিয়েছেন৷ একটি দৃশ্যে দেখা যায় যৌনতার প্রতি মারাত্মক আশক্ত হয়ে ১৪/১৫ বছরের এক কিশোর কল্পনায় বাবার বান্ধবীকে দেখছে। যে যৌন আবেদনময়ী হয়ে তার কল্পনায় ধরা দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবিক বিষয় হলো বাবার সে বান্ধবী ওই কিশোরের জন্ম দেয়া মা! ঘটনাটি যখন কিশোর জানতে পারলো, তখন সে লজ্জায় নিজের প্যান্টের জিপার খুলে শিশ্নের প্রতি একদলা থুথু নিক্ষেপ করে নিজের পৌরুষকে তীব্রভাবে ঘৃণা জানালো! এই যে আজকে একের পর এক নারী নিপীড়ন, ধর্ষণ – এরপর ভিডিও করে হুমকি এবং এক পর্যায়ে সে ভিডিও প্রকাশ করে পুনরায় ধর্ষণ করা; এসব দেখে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে নিজের প্রতি, নিজের পৌরুষের প্রতি তীব্র ক্ষোভ জন্মাচ্ছে।

সে ক্ষোভ কখনো কখনো শিশ্নের প্রতি একদলা থুথু হয়ে বের হতে চাচ্ছে। আবার কখনো কখনো এই পুরুষ হয়ে জন্মানোর লজ্জায় শিশ্ন নামক বস্তুটিকে ত্যাগ করতে ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতির নির্মমতা চাইলে শিশ্ন ত্যাগ করতে পারছি না। ফলে বিকারগ্রস্থ, ধর্ষকামী সমাজে একটু মানুষ হওয়ার তাড়না আমাকে বারবার দাঁড় করাচ্ছে বিবেকের কাঠগড়ায়। সেখানে দাঁড়িয়ে ভাবছি, পৌরুষত্ব শিশ্নে থাকে ঠিকই। কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় মগজ দিয়ে। আমরা কি মগজ দিয়ে ভাবছি?

যদি ভেবে থাকি তবে কি এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পাশবিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি না কেন? কিছুদিন আগে এক দাদা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ধর্ষণের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদী লেখা দেয়া যায় কিনা!’ প্রথমে ভাবলাম, বেশ কয়েকজন তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদন আকারে একটি লেখা দাঁড় করাবো। কিন্তু আজকে কিছু বিষয় দেখে মনে হলো, এই যে পাশবিকতা দেশের আপামর জনগণ অবলোকন করলো এবং করার পর প্রত্যেকের উপলব্ধি, দেশে যা হচ্ছে তা মারাত্মকভাবে আমাদের হুমকিসরূপ।

আমার এক কলেজ বন্ধুর সঙ্গে কথা হলো। সে জানালো, আমরাও তো পুরুষ! কই রাস্তায় কোনো নারীর দিকে তো একবারও তাকাই না! বুকের দিকে, নিতম্বের দিকে তাকিয়ে লালা ঝরে না! শালার ব্যাটারা কি মজা পায় এসব করে?

এই যে ‘কি মজা পায়?’ প্রশ্ন তার মধ্যে জেগেছে, এমন আরো অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন ‘কি মজা পায়?’ অবশ্য এই প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর আছে। পুরুষতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য নারীর উপর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা পুরুষের জন্মগত স্বভাব। ফলে মজা-টজা এখানে আপেক্ষিক, কর্তৃত্ববাদী হওয়াটাই বরং মূখ্য। ফলে এ সমাজটিই একটি আস্ত শিশ্নে পরিণত হয়েছে। বোধদয় হচ্ছে মানুষের। কিন্তু তা শেষ বেলায়; নিপীড়নের পাশবিকতা দেখে। কিন্তু এখন আঙুল কামড়িয়ে, আহা! উহু! করে কোনো লাভ নেই, যদি আপনি ধর্ষক সমাজের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোঁজা করা না দাঁড়ান। আর যদি দাঁড়ানোর ক্ষমতা না থাকে, শিশ্নের ভাড়ে নুয়ে পড়েন – তাহলে আপনার শিশ্ন কেটে ফেলুন।

আহা! উহু! করে যেমন নোয়াখালীর ওই নারীর আর্তনাদের মূল্য দিতে পারবেন তেমন ফিরিয়ে দিতে পারবেন না কল্পনা চাকমা, তনু, আফসানাদের মত ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীদের জীবন। যেহেতু এসব আপনি পারবেন না সেহেতু সব বাদ দিয়ে প্রতিবাদ আপনাকে করতেই হবে, প্রতিবাদ করতেই হবে আগামীর নারীদের নিরাপত্তার জন্য। এখন আমাদের সামনে একটিই পথ রুখে দাঁড়ান নয়তো শিশ্ন কেটে ফেলে পুরুষ হওয়ার লজ্জা থেকে বাঁচুন।

 

  • শাকিল মাহমুদ, লেখক ও সাংবাদিক

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ