পিতৃগণ

এই উপন্যাস ইতিহাস কে খোঁজা। এই উপন্যাস নিজের আত্ম পরিচয় খোঁজা। এই বই নিজের পূর্ব পুরুষ কে খোঁজার। নিজের জনক,পিতৃব্য, পিতৃগণ কে খোঁজা।

এই বইয়ের সাথে আমার নিজের অতীত, নিজের মাটি, নিজের মাতৃকার সম্পর্ক। ‘পিতৃগণ’ বইটি কৈবর্ত বিদ্রোহ নিয়ে লেখা।

ধরা হয় পাল সাম্রাজ্য ছিল অতীতের অন্যান্য সাম্রাজ্যের চাইতে অধিকতর প্রজাবৎসল। এই সময়ে গোপাল, মহীপাল, রামপাল অনেক মঠ, বিহার স্থাপন করেছে। পালরা বৌদ্ধ হলেও হিন্দুরা স্বাচ্ছন্দ্যেই ছিল। রাজার অমাত্য দের অনেকেই হিন্দু ছিল। প্রজারা সুখেই ছিল।

ছিল কি?

পাল রাজা হিন্দু, বৌদ্ধ প্রজাদের প্রতি নেক নজর দিলেও, অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতি ছিল নিষ্ঠুর। পাল সাম্রাজ্যের বিশাল আয়তনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারে ছিল কৈবর্ত, ভীল, রাজবংশী। পাল রাজারা এদের প্রতি ছিল অত্যাচারিত। এদের প্রতি অন্যায্য করের বোঝা চাপিয়ে দিত, অর্থ ছাড়া শ্রম ছিল, আবার অমানবিক অত্যাচার তো ছিলোই।

বরেন্দ্র অঞ্চলে বাস ছিল কৈবর্ত দের। কৈবর্ত রা স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল। পাল রাজার অধীনে থাকতে চায় নি। তারা এই বঞ্চনা চায় নি। তারা যেহেতু হিন্দু বা বৌদ্ধ ছিল না, তাই তারা ধর্মের দিক থেকেও স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু মহাপরাক্রমশালী পাল রাজারা কিছুতেই এই অধস্তন, নীচু জাতির দম্ভ মেনে নিতে পারছিল না। তাইতো তারা কখনো জলকর, ভূমিকরের মত অমানবিক বোঝা চাপিয়ে দিত কৈবর্ত দের উপর। কৈবর্ত রা এসব বঞ্চনা লাঞ্চনা মেনে নেয় নি।

কৈবর্ত রা বিদ্রোহ করে, এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয় প্রথমে দিব্যোক, পরে রুদোক আর শেষে ভীম।

পাল রাজার ছিল সভাকবি সন্ধ্যাকর নন্দী, সেই নন্দী রাজার অনুগ্রহে রাজার স্তুতি কাব্য লিখে গেছে, নিন্দে করেছে কৈবর্ত দের। ইতিহাস নাকি বিজিত দের লেখা পরাজিত দের নামে একরাশ কুৎসা। ইতিহাসের এই অবাঞ্চিত জনপদ কৈবর্ত দের পক্ষে কাউকে তো কলম তুলতে হবে! তাইতো কলম তুলল তাদেরই জনপদের কবি পপীপ।

এটাতো হল গল্পের কাহিনী।

বই টা নিয়ে কিছু বলার আছে। লেখক অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে উপন্যাস লিখেছেন, তা ভূমিকা পড়ে বা বই পড়েও বোঝা যায়। অনেক এলিমেন্ট যোগাড় করেছেন। তবুও কেন জানি স্বার্থক উপন্যাস হতে পারেনি। ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাসে সুকৌশলে কোন প্রোপাগান্ডা ছড়ানো যায়, লেখক ছড়ান নি। তবে দেব দেবীর কেচ্ছা কাহিনী, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের যৌন জীবন তিনি টেনে এনেছেন, যা বাহুল্য লেগেছে আমার কাছে। ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস হিসেবে ভাষা যেমন হবার কথা তেমনই ছিল, সেই সময় কে ধারণ করতে ভাষার ব্যবহারে লেখক মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন যা প্রশংসা পাবার যোগ্য। তবে ক্যারেকটার ডেভেলপ করেও শেষ পর্যন্ত যেমন মেলে ধরেনি পপীপ। তেমনি গল্পের আসলে প্রধান চরিত্র কে, সেটা নিয়েও সংশয় থেকেছে। কখনো পপীপ, কখনো মল্ল, কখনো বা ভীম।

একটা সুন্দর শুরু করেও, কেন জানি একটা সুন্দর বই পড়ার যে তৃপ্তি তা থেকে বঞ্চিত হয়েছি।

বরেন্দ্র অঞ্চলে জন্ম বলেই এই বইটা আমাকে আলাদাভাবে টেনেছে। পড়লাম নিজ অঞ্চলের পুরানো ইতিহাস। পিতৃগণের ইতিহাস।

 

  • আতিকুর রহমান সৌরভ, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ