দক্ষিণায়নের দিন : মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে চপেটাঘাত

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে ট্রিলজি লেখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আজ আমি আপনাদের সামনে এমনই এক ট্রিলজি নিয়ে কথা বলব। তবে এই উপন্যাস সাম্প্রতিক সময়ে লেখা না। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে লেখা। সময় টা বাংলাদেশের ইতিহাসে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশ নানা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় পার করছে। শওকত আলীর লেখা ট্রিলজি উপন্যাস দক্ষিণায়নের দিন সেই সময়ে লেখা। এক ঘটনাবহুল সময়ে বাস করে শওকত আলী আঁকার চেষ্টা করেছেন আরেক ঘটনাবহুল সময় কে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী অস্থির সময় ও বামপন্থা রাজনীতির তৎকালীন স্বরুপ বিশ্লেষণের উপর লেখা এই বই এক প্রামাণ্য দলিল। দক্ষিণায়নের দিন (১৯৭৬), কূলায় কালস্রোত (১৯৭৭) আর পূর্বরাত্রি পূর্বদিন (১৯৭৮) এই তিন উপন্যাস মিলিয়ে এই ত্রয়ী সংকলন।
এই ত্রয়ী উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হল রাখী। এই উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে তাকে কেন্দ্র করে,তার পরিবার, স্বামী-সংসার নিয়ে। তবে এখানে রাখীই কি সব?
না, কখনো রাখীর চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে ৬০ এর দশকের উত্তাল সময়, কখনো বা সেই উত্তাল সময়ের রাজনীতি।

দক্ষিণায়নের দিন

বাসাতে রাখী, রাখীর অবসরপ্রাপ্ত বাবা, বড়বোন বুলু (নিঃসন্তান) ও দুলাভাই হাসান। মানুষের জীবনের সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ সময় ধরা হয় শিক্ষাজীবন কে। ট্রিলজি উপন্যাসের প্রথম খন্ড দক্ষিণায়নের দিন শুরু হয় রাখীর এই বৈচিত্র্যময় জীবনের সমাপ্তি দিয়ে। তার ভার্সিটির সাথে অফিসিয়ালি সম্পর্ক চুকে যায় গল্পের প্রথমেই। আর আশেপাশের সব মানুষ জিজ্ঞাসা করতে থাকে- এবার রাখী তুমি কি করবে? রাখী শেষ পর্যন্ত চাকরী করে। চাকরী করলেও সে সুখী হতে পারেনা। অনেকটা আপোষ কামী লাগে তার। এদিকে অফিসের বস মাজহার তাকে পছন্দ করে, পছন্দ করে ভার্সিটির জুনিয়র টিচার জামানও। কিন্তু রাখী কি এদের কাউকে পছন্দ করে? নাকি পছন্দ করে সেজান কে? যে সেজান তার মৃত ভাই মনির রাজনৈতিক বন্ধু। মনি আর সেজান দুজনেই বামপন্থী রাজনীতি করত। মনি মারা যায় অসুখে ভুগে, অজপাঁড়াগায়ে রাজনীতি করতে গিয়ে। আর সেজান জেল থেকে বের হয়। যদিও রাখীর জামানকে বিয়ের মাধ্যমে শেষ হয় উপন্যাসের প্রথম খন্ড – দক্ষিণায়নের দিন।

কথাসাহিত্যিক শওকত আলী

যারা আমাদের দেশে বামপন্থী রাজনীতি করে তাদের বলা হয় দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলে বিশ্বাসী। সেজান আর মনির রাজনৈতিক কর্ম আর ষাটের দশকের বামপন্থী রাজনীতির ব্যাপার স্যাপার এসেছে বলেই উপন্যাসের নাম দক্ষিণায়নের দিন। উপন্যাসের দ্বিতীয় খন্ডের নাম ‘কূলায় কালস্রোত’। কূলা বলতে নীড় বা বাসা বোঝায়। আর কালস্রোত বলতে প্রতিকূল অবস্থা বোঝায়। এই উপন্যাসে আমরা দুই সংসারে টালমাটাল অবস্থা দেখি। রাখীর সংসারে। আবার তার বড় বোন বুলুর সংসারেও । বিয়ের পর রাখীর স্বামী পরিবর্তন হতে শুরু করে। রাখী দেখে প্রেম না, বরঞ্চ জামান তার প্রতি সম্ভোগের দৃষ্টিতে দেখে। স্বামীর এই নেতিবাচক পরিবর্তন মুখ বেঝে সহ্য করলেও স্বামীর বিরুদ্ধে রাখীর প্রথম বিদ্রোহ কন্ট্রাসেপটিভ পিল নিতে অস্বীকার। আর ওদিকে বুলু আর হাসানের মাঝে কলহ শুরু হয় যখন হাসানের হাতে দিন দিন কাঁচা পয়সা হতে শুরু করে। বুলু স্বামীর প্রতি প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে পরিবর্তন আনে নিজের চলাফেরায়। সেও স্বামীর মত পার্টিতে যাওয়া শুরু করে, হাসানের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা শুরু করে। পোশাক পরিচ্ছদ ও চালচলনে উগ্রতা চোখে পড়ে। এভাবেই বুলু মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর দুর্ঘটনায় রাখীর বাচ্চা নষ্ট হলে সে শহর থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। একাজে সাহায্য করে তার বান্ধবী সুমিতা। রাখী ঠাকুরগাঁও এর একটা মহিলা কলেজে ইতিহাসের শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করে। তার এই ঠাকুরগাঁও যাত্রার মাধ্যমে দ্বিতীয় উপন্যাস শেষ হয়।
উপন্যাসের তৃতীয় ও শেষ খন্ডের নাম পূর্বরাত্রি পূর্বদিন। মুক্তিযুদ্ধের আগের অস্থির, বিভীষিকা আর ভীতিকর দিন রাত্রিকে বুঝিয়েছেন লেখক এই শিরোনামে। এই গল্পে রাখী ঠাকুরগাঁও এ গিয়ে কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ে। সে মেয়েদের কলেজে মেয়েদের নাচ গান আর খেলাধুলা শেখানো শুরু করে। এরফলে সে মৌলবাদীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়।
তাকে এই অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে উদ্ধার করে সেজান। সেজান রাজনৈতিক কারনে ঠাকুরগাঁও তেই আছে। রাখী একদিন তাকে দেখতে যায়, গিয়ে দেখে সেজান খুব অসুস্থ সহকর্মী দের অবহেলায়। অসুস্থতা বাড়লে রাতের আড়ালে ভাল চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনে রাখী। সেজান সুস্থ হয়। তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। সেজান আবারো শ্রেণীসংগ্রামে যোগ দিতে নিরুদ্দেশ হয়। এরপর রাখীর কাছে সেজানের মৃত্যু সংবাদ আসে। কিন্তু ততদিনে রাখীর গর্ভে সেজানের সন্তান। রাখী গর্বভরে এই সন্তান কে লালন পালন করতে চায়। সে অনাগত সন্তানের অপেক্ষায় বসে থাকে। আর এভাবেই বিশাল এই উপন্যাসের পরিসমাপ্তি ঘটে।
দক্ষিণায়নের দিন উপন্যাসে মূখ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ের রাজনীতি ও বাম রাজনৈতিক দলের দল উপদল ও কোন্দল। নেতা কর্মীদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি। হাসানের মত সুবিধাভোগী গোষ্ঠীরা প্রথমে আওয়ামী লীগের ছয়দফার বিরোধিতা করলেও পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। বাম দলের যে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কথা ছিল নিজ দল গুলোর মাঝে ভুল বোঝাবুঝির জন্য তারা ক্রমশ দূরে সরে যায়।
ঢাকা রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ছয়দফার পর ঢাকা ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকে। আন্দোলন মিছিল ধরপাকর চলে, আসাদ মারাও যায়। কিন্তু গ্রাম? গ্রামে কি চলে? গ্রামে মনি সেজানের মত ত্যাগী কর্মীরা অন্ত্যজ মানুষ কে নিয়ে শ্রেণীসংগ্রামের আহবান করে। ছোট ছোট কৃষক বিদ্রোহ, জমিদার দের বিরুদ্ধেও বেশ কিছু আন্দোলন হয় রিমোট এরিয়া গুলোতে। কিন্তু বিনিময়ে তারা কিছু পায় না। নেতৃত্ব স্থানীয় মানুষের গোঁয়ার্তুমির জন্য মনি আর সেজানের মত নিবেদিত প্রাণ কর্মীদের জন্য ধুঁকে ধুঁকে মরা ছাড়া কোন গতি থাকেনা। রাখীর মাঝে আমরা একজন সোসাইটির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক নারীকে খুঁজে পাই। সেজান ও সে স্বীকৃত কোন সম্পর্কে আবদ্ধ ছিল না। রাখী তার স্বীকৃত সম্পর্কের বাচ্চাকে অ্যাবরশান করাতে চেয়েছিল, পক্ষান্তরে তার প্রেমিকের সন্তান কে সে গর্বভরে মানুষ করতে চেয়েছিল। যা একই সাথে সাহসী ও অনন্য। ঠাকুরগাঁও এর মহিলা কলেজে মেয়েদের সংস্কৃতি চর্চায় আগ্রহী করা ও পক্ষান্তরে তার প্রেমিকের সন্তান কে সে গর্বভরে মানুষ করতে চেয়েছিল। যা একই সাথে সাহসী ও অনন্য। ঠাকুরগাঁও এর মহিলা কলেজে মেয়েদের সংস্কৃতি চর্চায় আগ্রহী করা ও কুৎসা রটনাকারী দের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মাধ্যমে মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে চপেটাঘাত করে এই বই।
  • আতিকুর রহমান সৌরভ, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ