ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী : বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতীক

প্রবেশিকা পরিক্ষায় অংশগ্রহণের পূর্বে ১৯০৮ সালে নারায়নগঞ্জ থেকে জীবনে প্রথমবারের মত গ্রেপ্তার হন মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্বে তিনি নিশ্চই জানতেন না যে এই জেলেই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি দশক কাটিয়ে দিতে হবে। তবে তিনি এটা নিশ্চই জানতেন, প্রিয় মাতৃভূমি ভারতকে স্বাধীন করার যে লড়াই শুরু করেছেন তা অতি সহজে জয়ী হবার নয়। ত্রৈলোক্যনাথকে যখন গ্রেপ্তার করা হয় তখন তিনি শীতলক্ষা নদীতে নৌকার মধ্যে ছিলেন। এসময় তাঁর সঙ্গে থাকা দুই সহপাঠি যদুনাথ দাস ও বিনোদ চক্রবর্তী ও গ্রেপ্তার হন। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তাঁরা নৌকা চুরি করে ডাকাতি করতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই পুলিশ তাদের পথিমধ্যে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। তারপর তাঁদের বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগ এনে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। অগত্যায় আনা হয় নৌকা চুরির অভিযোগ। কয়েকমাস জেল খাটার পর তাঁদের পাঁচ মাস সশ্রম কারাদ- হয়, সেইসাথে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা। টাকা পরিশোধ করতে না পারলে কাটতে হবে আরও একমাস জেল। গ্রেপ্তারের সপ্তাহখানেক পর তাঁদের নারায়নগঞ্জ জেল থেকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তর করা হয়। ঢাকা জেলে তাঁদের তিনজনকেই ঘানি টানতে হয়েছে। জরিমানার নির্ধারিত পঞ্চাশ টাকা পরিশোধ করে প্রথমবারের মত জেল জীবনের দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯০৯ সালে মুক্তি পান ত্রৈলোক্যনাথ। এরপর আরও অসংখ্যবার গ্রেপ্তার হন মহারাজ।

মহারাজ তাঁর জেলজীবন নিয়ে বলছেন- ‘আমি ভারতবর্ষের মধ্যে, ভারতবর্ষ কেন সম্ভবত পৃথিবীর মধ্যে  রাজনৈতিক কারণে সর্বাপেক্ষা অধিক বৎসর যাঁহারা কারাগারে কাটাইয়াছেন, তাঁহাদের অন্যতম। আমি ১৯০৮ সন হইতে ১৯৪৬ সন পর্যন্ত ৩০ বৎসর কারাগারে কাটাইয়াছি, ৪-৫ বৎসর অজ্ঞাতবাসে কাটাইয়াছি।

… বাংলা দেশের ছয়টি সেন্ট্রাল জেলে এবং কয়েকটি ডিস্ট্রীক্ট জেলেও ছিলাম। আমি বহু বৎসর সাধারণ কয়েদীর মত ছিলাম, দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদী ছিলাম এবং বিশেষ শ্রেণীর (special class) কয়েদী ছিলাম। আমি স্টেট- প্রিজনার ছিলাম, ডেটিনিউ ছিলাম, সিকিউরিটি বন্দী ছিলাম এবং অন্তরীণাবদ্ধও ছিলাম। জেলখানার পেনাল কোডে যেসব শাস্তির কথা লেখা আছে এবং যে-সব শাস্তির কথা লেখা নাই, তাহার প্রায় সবগুলি সাজাই ভোগ করিয়াছি।’ [জেলে ত্রিশ বছর ও পাক- ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, পৃষ্ঠা- ১২-১৩]

বৃটিশ শাসকদের ভিত কাঁপিয়ে দেয়া ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতীক। বিপ্লবী কর্মকান্ডের কারণে অগ্নিযুগে যে কয়েকজন মানুষ ভারতবর্ষে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, বৃটিশ শাসকদের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী তাঁদের অন্যতম। বাংলার নির্যাতিত-নিপিড়িত, মুক্তিকামী মানুষের প্রিয় মহারাজের জন্ম ১৮৮৯ সালের ৫ মে, বঙ্গাব্দ-২২ বৈশাখ ১২৯৬ সালে বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার কাপাসাটিয়া গ্রামে। এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হয় তাঁর। মহারাজের বাবার নাম দুর্গাচরণ চক্রবর্তী, মাতা প্রসন্নময়ী দেবী। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম।

এক পাতানো যুদ্ধে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন, বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে ইংরেজরা ভারতবর্ষে ক্ষমতায়িত হয়, চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা হারায় ভারতবাসী। ছিনিয়ে নেয়া সেই স্বাধীনতা বৃটিশদের কাছ থেকে ফিরিয়ে আনতে জীবনের সবটুকু সময় বিসর্জন দিয়েছেন ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। শুধু কী সময়! দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, জেলে বন্দী থাকা থেকে শুরু করে অসহনীয়, শারিরীক ও মানষিক নির্যাতন সইতে হয়েছে তাঁকে। তবু তিনি দমে যাননি, দমে যাওয়ার মানুষ তিনি নন। ভয়-ডর বলতে কোন বিষয় তাঁর জীবনে ছিল না। জেল-পুলিশের নির্যাতনে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন কিন্তু কখনও আর্দশিক অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসেননি। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবার বিপুল উদ্যমে অনুশীলন সমিতির হয়ে কাজ করে গেছেন অকুতোভয় মহারাজ।

মহান এই বিপ্লবীকে সবাই পছন্দ করতেন। এমনকী প্রতিদ্বন্দী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা পর্যন্ত তাঁকে সমীহ করতেন। উদ্দেশ্য এক হলেও অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের মধ্যে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য বিরোধ ছিল। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর সাথে কারো বিরোধ ছিল না। অসাধারণ এক ব্যক্তিত্বগুণে তিনি তা অর্জন করেছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মত বিশ্ববরেণ্য নেতারা তাঁকে স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। মহারাজকে শ্রদ্ধা করতেন বাংলার আরেক স্বাধীনতাকামী নেতা বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান।

মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী শুধুমাত্র একজন বিপ্লবী ছিলেন না। তিনি একাধারে লেখক, কবি, চিন্তাবিদ, একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকও। তিনি যেমন কবিতা লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন গীতার ভাষ্য। লিখেছেন জেলখানার অভ্যন্তরের সমস্যা ও সংকট নিয়ে। স্কুলের জন্য পাঠ্য বইও রচনা করেছেন। সবকিছু ছাপিয়ে ‘জেলে ত্রিশ বছর ও পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বইটির জন্য তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে আর্বিভূত হয়েছেন। কালের বিবর্তনে গ্রন্থটি অগ্নিযুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে। বৃটিশ শাসনের ইতিহাস জানতে হলে বইটির পাঠ আবশ্যিক। অন্যথায় তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

অসামান্য দেশপ্রেমিক এই মানুষটি বৃটিশ শাসনের সময় ত্রিশ বছর জেল খেটেছেন। আত্মগোপনেও থেকেছেন পাঁচ-ছয় বছর। এরপর স্বাধীন দেশেও তাঁকে অত্যাচার-নির্যাতন সইতে হয়েছে। পাকিস্তান সরকার তাঁকে কারা অন্তরীণ করেছে। আজীবন অকৃতদার মহারাজ মানুষের জন্য একটি গণতান্ত্রিক সমাজ, উন্নত সমাজ নির্মাণের জন্য আমৃত্যু লড়াই করেছেন। আরও ব্যাপকভাবে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। দেশভাগের পরও মহারাজ কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তখন কংগ্রেসের নাম ছিল পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস। কিন্তু একসময় দলের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এটি অবশ্য নীতি ও আদর্শগত কোন বিরোধ ছিল না। বিরোধ তৈরি হয়েছিল দলের রণনীতি নিয়ে। দলের মধ্যে দুটি বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠে। দুই পক্ষের এক অংশে ছিলেন মনোরঞ্জন ধর, নেলি সেনগুপ্তা ও বসন্ত কুমার দাস। তাঁরা পাকিস্তানে কংগ্রেস দল টিকিয়ে রাখার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এর বিরোধিতা করেন মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রভাস লাহিড়ি প্রমুখ। মহারাজ অংশের মত ছিল, পাকিস্তানের কংগ্রেস যেহেতু হিন্দুদের সংগঠনে রূপ নিয়েছে, তাই এর আর প্রয়োজন নেই। এই কংগ্রেস পার্টিকে দিয়ে আর বৃহত্তর জাতীয় উদ্দেশ্য সাধন করা সম্ভব নয়। এবিষয়ে তাঁরা একমত হতে না পেরে পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস থেকে বের হয়ে আসেন। পরবর্তী সময়ে তাঁরা এক হতে না পারায় বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করেন। মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী ‘সংযুক্ত প্রগতিশীল দল [ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ পার্টি] থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকা ছিল পূর্ব- ময়মনসিংহ। নেত্রকোনা মহকুমার ১২টি থানা ও কিশোরগঞ্জ মহকুমার ৮টি থানা নিয়ে এই আসনটি গঠিত হয়।

নির্বাচনে সর্বাধিক ভোট পেয়ে জয়ী হন মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ। দ্বিতীয় হয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী নগেন সরকার। নির্বাচনে জয় লাভ করে যুক্তফ্রন্টের সময়ে সরকার পক্ষের এম. পি. এ হয়েছিলেন মহারাজ। তবে এই জয় পেয়েও শেষ পর্যন্ত সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি তিনি। কারন যে ভোটাররা ভালোবেসে ভোট দিয়ে তাঁকে নির্বাচিত করেছে, তাঁদের জন্য কয়েকটা টিউবওয়েল বসানো ছাড়া তেমন কিছু করতে পারেননি তিনি। এজন্য দুঃখ প্রকাশও করেছেন। এখানেই শেষ নয়, এম. পি. এ নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে আরও যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে।

ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর নির্বাচনীকাজে সে সময় নেত্রকোনা এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের অন্যতম চিন্তাবিদ, লেখক, অধ্যাপক যতীন সরকার। তিনি সে সময় মেট্রিক পরিক্ষার্থী ছিলেন। ১৯৫৪ সালের এপ্রিল মাসের ছিল তাঁর পরীক্ষা। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় মার্চ মাসে। পরীক্ষার প্রস্তুতি বাদ দিয়ে তিনি মহারাজের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারের কাজ করেন। তিনি তাঁর ‘পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু-দর্শন’ গ্রন্থে লেখেন- …৬ জন প্রার্থীর মাত্র একজনকে আমি তখন নিজের চোখে দেখেছি। তিনি ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। ত্রৈলোক্য মহারাজ নামেই যার সমাধিক পরিচিতি। ত্রৈলোক্য মহারাজ রামপুর বাজার এসে সভা করেছিলেন। তার সঙ্গে এসেছিলেন আরেকজন নেতা জ্ঞান মজুমদার। এদেরকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন আমাদের আশুলিয়া ইউনিয়ন বোর্ডের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিশিবাবু- নিশিকান্ত ভট্টাচার্য। আমার প্রিয় শিক্ষক কুমুদ ভট্টাচার্য ও জয় চন্দ্র রায়, আর আমার পিতৃ বন্ধু কামিনী কুমার চক্রবর্তী ও সুরেন্দ্র চক্রবর্তীসহ আমাদের গায়ের ও আশপাশের সকল গায়ে আমরা যারা গুরুজন স্থানীয়, তাদের প্রায় সবাই ছিলেন ত্রৈলোক্য মহারাজের সমর্থক। মহারাজকে দেখে ও তার কথা শুনে সেদিন আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম। চেহারায় তার তেমন কোন আকর্ষনীয় বৈশিষ্ট কিছু নেই। অথচ, এই ছোটখাটো মানুষটিই কিনা ছিলেন ব্রিটিশ শাসকদের ত্রাস, ৩০ বছর তারা তাকে জেলে আটকে রেখেছিল। কোন জেল জুলুমই যে মানুষটিকে নতি স্বীকার করাতে পারেনি সেই মানুষটিই এসেছেন আজ আমাদের কাছে ভোট চাইতে। এঁকে তো আমরা কিছুতেই ফিরিয়ে দিতে পারি না। নিশিবাবু আর কুমুদ বাবু আমাকে ত্রৈলোক্য মহারাজের পক্ষে প্রচার কাজ চালাতে উদ্বুদ্ধ করলেন। সহপাঠী বন্ধু অনঙ্গ মোহন সরকারকে নিয়ে আমি সোৎসাহে সে কাজে লেগে গেলাম। এরপর সিংহের গ্রামের গোপাল দাস ও সে গ্রামেরই কর বাড়ির আরেকজন যুবক আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। তবে প্রচার কাজে আমার আর অনঙ্গর উৎসাহই ছিল সবচেয়ে বেশি। টিনের চুঙ্গায় মুখ লাগিয়ে হাটে হাটে গিয়ে বক্তৃতা দিতাম। আমাদের আশেপাশের গ্রাম গুলোর বর্ণ হিন্দুদের বাড়ি বাড়ি ঘুরেও প্রচারকাজ চালিয়েছি’। [পৃষ্ঠা- ২০৪-০৫]

একান্তে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ও মহারাজ

জীবনসায়াহ্নে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারত যান ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। প্রথমে অসম্মতি জানালেও ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ তদারকিতে ভিসা দিতে সম্মত হয় পাকিস্তান সরকার। প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে ভারতে যাবার প্রাক্কালে বিবৃতি দেন তিনি। জীবদ্দশায় এটিই তাঁর শেষ বিবৃতি। ১১ জুন বিবৃতিটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদ ও দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হয়। সে সময় পাকিস্তানে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছিল। ৭০ সালের এই নির্বাচনটি ছিল পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহারাজের বিবৃতিটিও ছিল এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই। আগামী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি দেশবাসীকে সৎ ও দেশপ্রেমিক প্রার্থীদের নির্বাচিত করার আহবান জানান।

তিনি বলেন- ‘আগামী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী নির্বাচনের উপর জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করিতেছে। কারণ যাহারা নির্বাচিত হইবেন, তাঁহারাই শাসনতন্ত্র রচনা করিবেন। এজন্য প্রয়োজন যাহাতে উপযুক্ত ও যোগ্য লোক নির্বাচিত হয়। এখন উপযুক্ত লোক কে? যিনি দেশপ্রেমিক, বিদ্বান ও সৎলোক তিনিই উপযুক্ত লোক। এইরূপ নির্বাচিত সদস্যগণ জাতির ভবিষ্যৎ চিন্তা করিয়া জাতির কল্যাণের জন্য শাসন-তন্ত্র রচনা করিবেন। সদস্য নির্বাচিত হইবে ভোটারদের ভোটে। ভোটারগণ যেরূপ বীজ বপন করিবেন, ফলও সেইরূপ পাইবেন। এজন্য ভোটারদের দায়িত্ব অত্যন্ত অধিক। ভোটারগণ যেন স্বাধীনভাবে ভোট দেন। তিনি প্রসঙ্গত বলেন, স্বাধীনতা লাভের পর হইতে এ পর্যন্ত কোন স্থায়ী শাসনতন্ত্র রচিত হইল না, ইহা জাতির পক্ষে অত্যন্ত কলংকের বিষয়। কিছু লোকের মনে সন্দেহ আছে ইলেকশন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হইবে না, আবার মার্শাল ল’ জারি হইবে। একশ্রেণীর লোক নির্বাচন পণ্ড করিতে চান, দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করিতে চান। যাহারা দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করিতে চান তাহারা জাতীর কল্যাণকামী নহেন। আগামী নির্বাচনের সময় যাহাতে দেশে শান্তি বজায় থাকে এবং নির্বাচন পর্ব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় সেদিকে দেশবাসীর সর্তক দৃষ্টি রাখিতে হইবে।’

অবশেষে ১৯৭০ সালের ২৪ জুন যশোরের বনগাঁ সীমান্ত দিয়ে মহারাজ ভারতে প্রবেশ করেন। এসময় সীমান্তে উপস্থিত ভক্তবৃন্দ অশ্রুসজল নয়নে তাঁকে বিদায় জানান। ভারতে পৌঁছে নানা অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। পুরানো বন্ধু, সহযোদ্ধা, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা করেন, কথা বলেন। সফরে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ হয় ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, ও সংসদসদস্যদের সাথে। সেখানে পাকিস্তানী শাসক দ্বারা নির্যাতিত পূর্ব-বাংলার মানুষের পাশে থাকার জন্য ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তবে সে আহ্বান প্রকাশ্যে ছিল না। পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাকামী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের পক্ষে তিনি আলোচনা করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। তাঁর পাশে থাকার জন্য তাঁদের পরামর্শ দেন মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ‘বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র’ বইতে- ‘শেখ মুজিব শ্রী চিত্তরঞ্জন সূতারকে ভারতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতীয় সরকারের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করার দায়িত্ব দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ দূত হিসেবে কোলকাতায় অবস্থান করার ব্যবস্থা করেন। ’৬৯ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদনের মাধ্যমে শ্রী সূতার জেল থেকে বেরিয়ে মুজিবের দূত হিসেবে কোলকাতায় অবস্থান নেন। অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও দক্ষতার সাথে শ্রী সূতার ভারত সরকারের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে সাহায্য, সহযোগিতা ও সহানুভূতি আদায় করতে সক্ষম হন। এই সময়ে মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী চিকিৎসার জন্য ভারতে যান এবং তিনিও দূতালিতে সাহায্য করেন। এমনকি হানাদারবাহিনীর আক্রমণে দিশেহারা বাঙালিকে ভারতে আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারে ভারতকে সহজে রাজি করানোর বিষয়ে শ্রী সূতার এবং ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর অবদানকে ভোলা যায় না। [নিউক্লিয়াস বিএলএফ স্বাধীনতা-বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র- কাজী আরেফ আহমেদ (আবদুর রাজ্জাক ও সিরাজুল ইসলাম খান) সম্পাদনায়- স্কোয়াড্রন লিডার আহসান উল্লাহ্ (অব.)পৃষ্ঠা- ৪৯- ৫০]

তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আর সময় নেই, তাই সবকিছু দ্রুততার সাথে চালিয়ে যান। প্রায় ৪৭ দিনের ভারত সফরের একদিনও বিশ্রাম নেননি তিনি। প্রতিটি দিন পার করেছেন অত্যন্ত ব্যস্ততার সাথে। ভারতের পার্লামেন্টেও ভাষণ দিয়েছেন। এটি তাঁর জন্য বিশাল এক প্রাপ্তি। মৃত্যুর তিনদিন পূর্বে ১৯৭০ সালের ৬ আগস্ট দিল্লীর পার্লামেন্টে এমপিদের সংবর্ধনার উত্তরে তিনি এই ভাষণ প্রদান করেন। মহারাজ সেদিন বাংলা ভাষাতেই ভাষণ রেখেছিলেন।

ভাষণে তিনি বলেন-‘আজ যদিও আমি পাকিস্তানী নাগরিক কিন্তু ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশের অধীন ছিল তখন ইন্দো-পাক মিলিত এই অখণ্ড মহাদেশের স্বাধীনতার জন্য আমিও সংগ্রাম করেছি। আজ দেশ স্বাধীন -একজন স্বাধীনতা-সংগ্রামী হিসেবে আমি আজকের ছাত্র ও যুব সম্প্রদায়কে এর জন্য গর্ববোধ করতে বলবো। আমি মনে করি এ উপদেশ দেওয়ার অধিকার আমার আছে। কারণ আজ তারা যে স্বাধীনতা উপভোগ করছে আমি সেই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের একজন। উভয় দেশের যুবসম্প্রদায়ের কাছে আমি এই আবেদন রাখবো তারা যেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, সংগ্রাম করে অনগ্রসরতার বিরুদ্ধে এবং সর্বোপরি চেষ্টা করে শৃঙ্খলাপরায়ণ হতে, যাতে করে তাদের মাতৃভূমি জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করে।’

এর ঠিক দুই দিন পর ভারতের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে ৯ আগস্ট রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অনন্তের পথে পাড়ি জমান মহারাজ। তাঁর প্রায়ানের সংবাদ পেয়ে শ্রী সুরেন্দ্রমোহন ঘোষের বাসভবনে মহারাজকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। রাষ্ট্রপতির পক্ষে শ্রদ্ধা জানান তাঁর এডিসি। এসময় অনেক সংসদ সদস্য সেখানে উপস্থিত হয়ে মহারাজের মৃতদেহে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে গভীর শ্রদ্ধা জানান। শ্রদ্ধা জানান পাকিস্তানের হাই কমিশনার সাজ্জাদ হায়দার।  ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রী ভি ভি গিরি প্রয়াত ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোকবার্তায় বলেন- মহান বিল্পবী নেতা মহারাজের আকস্মিক মৃত্যুও সংবাদে আমি গভীরভাবে শোকাহত। দু-তিন দিন আগে তিনি যখন আমার সঙ্গে দেখা করেন, তখন আমি তাঁকে ভাল স্বাস্থে দেখেছি। তাঁর ভবিষ্যত কর্মসূচি নিয়ে তিনি আমার সঙ্গে আলোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য যেভাবে তিনি উপস্থাপিত করেন তা সত্যিই শুনার মত এবং চিন্তার যথেষ্ট খোরাক যোগায়। আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীও কর্মময় ও ত্যাগপুত জীবন ভবিষ্যৎ বংশদরদেও মনে অনুপ্রেরণা যোগাবে।  ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর স্মৃতিতে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদেন করে বলেন- মহারাজ আর নেই একথা তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাঁর কাছে মহারাজের মৃত্যু সংবাদ একটা বিরাট আঘাতের মত। তাঁর কথা অন্তরে বিরাট সাড়া জাগায়। তিনি ছিলেন ভারতের বিপ্লব যুগের ঐতিহাসিক ঘটনার একটি চলমান জীবন্ত ছবি। তাঁর উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা যখন খুব বেশি করে বোধ করছিলাম, ঠিক সেই সময়ে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি আরও উজ্জল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর নির্ভিকতা ও অটুট সাহস আগের যুগের যুবচিত্তে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। দীর্ঘকাল কারবাসে থাকা সত্বেও গণতন্ত্রেও প্রতি তাঁর বিশ্বাস কোনদিনই শিথিল হয়নি। জনগণের জন্য যারা কাজ করতে চান, মহারাজের দৃষ্টান্ত ও আন্তরিকতা তাদেও সকলকেই অনুপ্রাণিত করবে।

১৯৭২ সালের ১৩ এপ্রিল, ভারত থেকে মহারাজের শতাধিক অনুসারি তাঁর চিতাভস্ম নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে আসেন। সিদ্ধান্ত হয় ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে চিতাভস্ম বিসর্জন দেওয়া হবে। কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে ড. কুদরত-ই-খোদার সভাপতিত্বে মহারাজ ত্রৈলক্যনাথ স্মৃতি কমিটির উদ্যোগে মিন্টো রোডে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজুদ্দীন আহমদ ও খাদ্য মন্ত্রী শ্রী ফণিভূষণ মজুমদার। মহারাজের চিতাভস্ম যথাযোগ্য মর্যাদা সহকারে বিসর্জন দেওয়ার দিনটিকে বিশেষভাবে উদযাপনের জন বেশকিছু কর্মসূচীও নেয়া হয়।

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে মহারাজের চিতাভস্ম বিসর্জন

১৪ এপ্রিল, শুক্রবার মহারাজের চিতাভস্ম যথাযোগ্য মর্যাদাসহ-কারে ঢাকার বুড়িগঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়। চিতাভস্ম বিসর্জন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজুদ্দীন আহমদ, খাদ্য মন্ত্রী শ্রী ফনিভূষণ মজুমদার, ভূমি রাজস্ব বিভাগীয় মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবত, অধ্যাপক পুলিন দে, শ্রী দীনেশ চন্দ্র চক্রবর্তী প্রমুখ। হাজার হাজার মানুষ সেদিন বুড়িগঙ্গার তীরে উপস্থিত হয়েছিলেন, তাঁদের প্রিয় মহারাজকে হৃদয়ের গভীর থেকে আন্তরিক শ্রদ্ধা জানিয়ে চিরদিনের মত বিদায় জানাতে।

তথ্যসূত্র: বাংলার মহারাজ: ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, ফয়সাল আহমেদ, দ্যু প্রকাশন, ঢাকা, বাংলাদেশ। প্রথম প্রকাশ- ফেব্রুয়ারি ২০২০

 

  • ফয়সাল আহমেদ : লেখক ও গবেষক

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ