জলের গজল : মুহম্মদ নূরুল হুদা

এক

সেতার বেতারে বাজে, তুমি কোন্ তারে
বাহুতে রেখেছো যারে খোঁজো বারে বারে
যে থাকে শরীরে-মনে, একা সে থাকে না।

ভেবেছো পেয়েছো যাকে আর হারাবে না:
দখলীস্বত্বের ভিটে আর বাড়াবে না?
যে জন স্বগৃহে থাকে, একা সে থাকে না।

সঙ্গী তার টিকটিকি, মাকড়শার ডিম
পূর্বপুরুষের জমি, জলের জাজিম
বুকে বুক রেখে থাকে, একা সে থাকে না।

পিঁপড়েও গুড়ের গন্ধে সুদূরে দৌড়ায়
এক থেকে বহু হয়, সারি বেঁধে যায়
খায় দায় বাড়ি যায়, একা সে থাকে না।

প্রেমিক পিঁপড়ের জ্ঞাতি, শ্রমিকের জাতি
ভুবন ভ্রমণে সব ভ্রমণীর সাথী
প্রেমিক প্রেমেই থাকে, একা সে থাকে না।

 

দুই

তোমাকে পড়তে গিয়ে খুলে রাখি পাতা,
অক্ষরেরা উড়ে এসে জুড়ে বসে বুক;
হঠাৎ ঝাপসা সব, চোখের অসুখ।

সবুজের কাছে গিয়ে নতজানু হই
আমাকে শুশ্রূষা দাও, দাও ঝাড়ফুঁক
ভালোবেসে ভালো করো চোখের অসুখ।

পোষাঠোঁট টিয়ে এসে ঠোকরায় মণি
আকাশে ঝড়ের শুরু, বিজুলি অশনি
লাল ঠোঁট খুটে খায় চোখের অসুখ।

আমি তাই নির্বিকার নিরাকারে যাই
আমার সাকার কোনো মনৌষধি নাই
অশ্রুর দ্রবণে সারি চোখের অসুখ।

ভেজা চোখ ভেসে যায় জলের গর্জনে
আরোগ্যের ছলাকলা বজ্রের লবণে
সারে না চোখের জলে চোখের অসুখ।

 

তিন

জলথইথই জলতরঙ্গ বাজে
করোনার কালে বেনোজল মরে লাজে
জলের আড়ালে যদিও জলের কঙ্কাল।

ত্যাগের খুশিতে বাঁশিতে বাজেনি সুর
ছুরির শোণিতে তড়পায় পশু-ক্ষুর,
হাসে পিপাসায় যদিও জলের কঙ্কাল।

হত্যাগ্রহ সত্যাগ্রহ নয়
ঘোলা জল শুধু জলধির অপচয়
বেনোজলে ভাসে, যদিও জলের কঙ্কাল!

তোমার সজল আঁখিদুটি রাখো খুলে
সাজাও বাসর তারকার ফুলে ফুলে
জলের ভাসানে যদিও জলের কঙ্কাল।

এসো জলে ভাসি, ভালোবাসাবাসি খেলি,
হৃদয়ে হৃদয়ে পিপাসার মুখ মেলি
জলে-জঙ্গলে যদিও জলের কঙ্কাল।

 

চার

একাকি জলের খেলা বেহুলার ভেলা
লোহার বাসর ছেড়ে জল সারাবেলা
সতীত্ব পতির প্রেম, নয় সর্বনাশা।

গিরি ছেড়ে চূড়া ছেড়ে বঙ্গোপসাগরে
প্রেমের অঙ্কুর ছেড়ে ভ্রূণের অঙ্কুরে
ভালোবাসা জলে ভাসা, নয় সর্বনাশা।

মৃত নয় মৃতবৎ বেহুলার বর
শাড়ি তার তরবারি, হিংস্র ফণাধর;
চোখে চোখে স্বপ্ন বাসা, নয় সর্বনাশা।

যাদুর শিকারি আসে, আসে দস্যু খল
হাড়ে মাংসে মালা গেঁথে অশ্রু টলোমল
সুরক্ষা নারীর বল, নয় সর্বনাশা।

সুরক্ষিত হও নারী, স্বরক্ষিত হও
তুমিও সৃষ্টির সেরা, আর কিছু নও
বেহুলা সতীর ভেলা, নয় সর্বনাশা।

 

পাঁচ

সুখের লাগিয়া সুখ ছেড়ে খুঁজি সুখ
অতল জলের স্রোতে পলিভাসা সুখ
ছেড়ে যাই জলস্থল, ছাড়ি না তোমাকে।

দরিয়ানগর ছেড়ে শুভপুর সেতু,
ইয়াংসির তীরে পদ্মা যায় না অহেতু,
ছেড়ে যাই ভিটেবাড়ি, ছাড়ি না তোমাকে।

কাল ছেড়ে অন্য কালে বুড়োরা তরুণ
রমণীর ত্বকে শিরা হাসে সকরুণ,
ছেড়ে যাই হাসি-কান্না, ছাড়ি না তোমাকে।

তুমিও বদল করে এসেছো জীবন
মোহন মোড়ক ছেড়ে গোপন রিবন
সদর-অন্দর ছাড়ি, ছাড়ি না তোমাকে।

সুখ ছেড়ে বুক ছেড়ে অন্য মুখে যাই
সুখের লাগিয়া মুখ শুধু বদলাই
ভুবন-ভবন ছাড়ি, ছাড়ি না তোমাকে।

 

(জাগতিক প্রকাশন থেকে প্রকাশিত জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার কাব্যগ্রন্থ ‘জলের গজল’ থেকে পাঁচটি কবিতা)

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ