চুড়ির বাক্স

স্কুল পালিয়ে দুখু মিয়া কবি নজরুল হয়েছিলেন! আজকাল স্কুল পালানোর সুযোগ’ই নেই, কেবলই পড়া আছে -পড়া আছে। শৈশব নেই কৈশর নেই যৌবন নেই, একেবারে বার্ধক্য। আমার বড্ড করুণা জাগে, যখন দেখি – বইয়ের পাহাড় পিঠে চাপিয়ে সেই সূর্যমামা জাগার আগে কমল কচিরা স্কুলের পথে দৌড়াচ্ছে। দেখে মনে হয় ব্যাগগুলোর হাত পা গজিয়েছে। মগজ ভরা শুধু মুখস্ত বিদ্যা! পরীক্ষার খাতায় যেগুলো ঢেলে দিয়ে নাম্বার কামানো যায়। আমাদের সর্বাধুনিক বাপ মায়েরা প্রতিযোগিতার বাজারে সন্তানদের রেসের ঘোড়া বানিয়ে ছেড়েছে বটে। কানা ঘোড়ার সোজা দৌড় দেখে আমরা হাততালি দেই, বাপ মায়ের গর্বের শেষ থাকে না।

রেসের ময়দান ছেড়ে যাওয়া যাক স্কুল পালানোদের দুনিয়ায়। নিতান্ত নিভৃত পল্লীতে তখনো কিন্ডারগার্ডেন- কোচিং শিক্ষালয়ের রমরমা ব্যবসা শুরু হয় নাই। প্রাথমিক শিক্ষাটা গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে নিতে হতো। সরকারি বলতে যে এ দেশে ‘অগত্যা’ বোঝায়! সরকারি হাসপাতাল আছে, ঔষধ নাই কিংবা সুডাক্তার নাই। তেমনই স্কুল কলেজ আছে, পড়াশোনার মান নাই, ভালো শিক্ষক-শিক্ষিকা নাই। গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার থেকে শুরু করে দপ্তরি পর্যন্ত ঘুমায়, মোক্তার আলি মাস্টার ক্লাসে বসে পড়াতে পড়াতে ঘুমায়।শিক্ষিত পয়সাওলারা সন্তানসন্ততি নিয়ে শহরমুখো হতে থাকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে। গরিব চাষাভুষা মুটেমজুরের সন্তানেরা অগত্যা শিক্ষা লাভের সুযোগ নিতে যায় সরকারি স্কুলে। ক্লাস ফাইভে পড়ুয়া আমাদের স্কুল পালানো ছিমছিমে গড়নের চরিত্রটি উঠানে অপুষ্ট জলপাই গাছটির সাথে পিঠমোড়া করে বাঁধা, মালেক মিয়ার ছেলে তুহিন।

লঘুপাপে গুরুদণ্ড কথাটা এখানে খাটে, স্কুল পালিয়ে ছেলে নজরুল হোক -তা কোনো বাপ মা’ই চায় না।তুহিনকে রোজ সকালে দাদির তুলতুলে কোল থেকে ধরেবেঁধে মোক্তবে পাঠায় মা মরিয়ম বেগম। কোরান পাঠ শেখা প্রত্যেকটি মুসলমানের আবশ্যকিয়, তারপর না হয় ছেলে পড়ালেখা শিখে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার যা হওয়ার একটা হবে। ধর্মীয় শিক্ষাদানটা যে বাপ মায়ের কর্তব্য, তা না হলে ওপারে গিয়ে জবাবদিহিতা করতে হবে।

মালেক মিয়া হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও কোনোদিন এক ওয়াক্ত নামাজ ছাড়েনি। স্ত্রী মরিয়ম বেগমও তেমনই মালেক মিয়ার সুপ্ত বাসনা আছে, ছেলেকে বড় পাশ দিয়ে বড় মানুষ বানানো। নিজে পড়ালেখার সুযোগ পায়নি, তা বলে ছেলেকে তো আর অশিক্ষিত রাখা যায় না। কিন্তু কে বোঝাবে তুহিনকে এই কথা? পড়াশোনায় মন নেই, স্কুলের হাজিরা খাতায় নাম থাকলেও খোঁজ নিয়ে দেখা যায় ক্লাসে থাকে না।

স্কুলের হেডমাস্টার অভিযোগ করেছে, ক্লাসে উপস্থিত না থেকেও সহপাঠীদের ভয় দেখিয়ে রোল কলের সময় অন্য কাউকে দিয়ে ‘উপস্থিত স্যার’ বলিয়ে নিয়ে নিজের হাজিরা সেরেছে বহুবার। এই কর্ম ধরা পড়ে যাওয়ার পর, টিফিন পিরিয়ডে লুকিয়ে অফিস রুমে ঢুকে নিজে হাতে হাজিরা খাতা সেরেছে বেশ কয়েকদিন।

হেডমাস্টারের মতে ‘এমন শয়তান ছেলে আর দুটি হয় না।’

বার্ষিক পরীক্ষায় যখন বই ফেরত নেওয়া হয়, সবার বই ফেরত যোগ্য হলেও তুহিনের বই অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। শুধু কি অযোগ্য? বইয়ের এমন কোনো পৃষ্ঠা বাকি থাকে না, যেখানে বলপেনের কালির দাঁগ পড়েনি।মোক্তার মাস্টার তো বলেই বসেছে ঠাট্টাচ্ছলে ‘এই ছেলে বড় হলে ভিঞ্চি মোশাইয়ের থেকে বড় আঁকিয়ে হবে।’ বইয়ের ছবি গুলোতে দাড়িগোঁফ এঁকে দিয়ে পুরো ছবিটারই কারুকার্য পাল্টে দেওয়ার অসিম গুণ নিয়ে জন্মেছে তুহিন। ইংরেজি বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে; ক্লাসে ম্যাডাম আর ছাত্রছাত্রীদের পরিচয় পাঠের যে ছবিটি, ওই ছবির ম্যাডামটির মুখে পর্যন্ত দাড়িগোঁফ গজিয়ে দিয়েছে।

মোক্তবের মৌলভী সাহেব গেল জুম্মার নামাজ শেষে মালেক মিয়াকে ডেকে নিয়ে নালিশ করেছে, ‘ভাইসাব,আল্লাহর ঘর মসজিদে আপনার পোলার বাঁদরামি আর সহ্য হয় না, পোলারে অহন থেইকাই এট্টু অনুশাসনে বাঁন্ধেন।’ হাঁট থেকে ফেরার সময় নয়নের বাপ কথা শুনিয়েছে, ‘মিয়া ভাই, তুহিন তো নষ্ট অইতাছে, লগে আমার পোলাডারেও করতাছে।’ নানান দিক হতে নানান জনের অভিযোগে মালেক মিয়ার মাথা হেইট হয়ে যায়, ছেলেকে কড়া শাসন না করলেই নয়।

সকালে মোক্তব থেকে ফিরলে তুহিনের মা নাইয়ে খাইয়ে পরিপাটি করে স্কুলে পাঠানোর আয়োজন করে।মালেক মিয়া শুয়ে শুয়ে সব দেখেছে,বেশ কয়েকবার তুহিন বেঁকেবসেছে,’ মা স্কুলে যামু না,স্কুল ভাল লাগে না।’

মা বারবার ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করেছে, ‘তোর বাপ কিন্তু দেখতাছে সব।’

বাপকে তুহিন জমের মতো ভয় পায়, অনিহা নিয়ে স্কুলের পথে হাঁটা দেয়।

পথে মামুনের সাথে দেখা, মামুন ওদের জমিতে যাচ্ছে। নদীর চরায় ওই জমিতে মামুনের সাথে অনেকবার গেছে তুহিন স্কুল পালিয়ে। মামুনকে দাঁড়াতে বলে ভোঁদৌড় দিয়ে জুম্মাবাড়ির ব্রিজের গড়ান বেয়ে নেমে যায়। রবিউলদের বাঁশঝাড়েরপাশে বিশাল তেতুল গাছটি, ওটা দশ গ্রাম দূর থেকেও দেখা যায়। তেতুল গাছের গোড়ার মাটি বানে- বৃষ্টির জলে ধুয়ে শেকর বেরিয়ে আছে, শেকরের নিচে গুহার মতো জায়গা।

বৃষ্টি হলেও সে গুহায় জল ঢোকে না, তুহিনের গোপন ডেরা এটি। স্কুল পালিয়ে বই সাথে রাখার কোনো মানেই হয় না, তাই বই গুলো এই গাছের গুহাতেই নিরাপদ থাকে।

বই রেখে মামুনের গলা জড়াজড়ি করে হেঁটে চলে দুজন। স্কুল পেরিয়ে যেতেই পিছন থেকে হুংকার, ‘ওই খাড়া কইতাছি বদমাইশ।’

তুহিন চেনে এই কণ্ঠ, পিছনে না তাকিয়েই প্রাণপণে দৌড়। পিছনে জমদূতের ধাওয়া। দৌড় থামালে চলবে না, নদীর পারে খরখরে মাটিতে পা ফসকে গিয়ে ডিগবাজি খেতেখেতে নদীর তলদেশের ধানিজমিতে গিয়ে থামে তুহিন।

হাঁটু গোড়ালি ছিঁলে গেছে,ধুলোয় মাখামাখি শরীরে একটুও আর শক্তি নেই যে উঠে আবার দৌড় দিবে। অসহায় আত্মসমার্পণ করা ছাড়া উপায় নাই, যদি এই অবস্থা দেখে বাপজানের একটু করুণা পাওয়া যায়, ভেবে লুটিয়ে পড়ে তুহিন।

মালেক মিয়া এই মুহূর্তে পৃথিবীর সব থেকে নির্দয় প্রাণি, চৈত্রের এই চড়া বেলায় ছেলের পিছনে দৌড়ে মানবতার অবশিষ্টাংশ ক্রোধের কাছে হেরে গেছে।হিংস্র বাঘ যেমন শিকারের পিছনে ধাওয়া করে শিকারকে বাগে এনে ঝাপিয়ে পড়ে! মালেক মিয়া সেই মতো গিয়ে চুল মুঠিকরে টেনে তুলে হাতের কাচাকঞ্চির সামান্য ব্যবহার করেন। তারপর কাঁধে তুলে এনে উঠানে বেঁধে রাখেন।

যতক্ষণ না ছেলের তেজ কমে, প্রতিজ্ঞা না করে ‘আর কোনদিন স্কুল কামাই করব না’ ততক্ষণ খানাপিনা বন্ধ দাদি সায়রাবানুর আহাজারি মালেক মিয়ার রক্তচক্ষুর কাছে এসে মিইয়ে গেছে। বুড়ি নিজের দোচালা ঘরের জীর্ণ দরজায় কপাট এঁটে থেকে থেকেই বিলাপ করছে, ‘পোলাডা মরুক,ওরে পাষাণ বাপ রে। এমন বাপ এই দুনিয়ায় আর একখান নাই।’

সূর্য পশ্চিমে নিম গাছের উপর একটু যেন জিরিয়ে নিচ্ছে, সারাদিন রোদ ছড়িয়ে ক্লান্ত সে। নিম গাছের ছায়া এসে পড়েছে তুহিনের পায়ের কাছে, সূর্য আর একটু হেলে পড়লেই মুখে এসে পড়বে ছায়া।

আজ সূর্যও কেমন নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে, তেষ্টায় গলা কাঠ হয়ে গেছে তুহিনের। মাটি দিয়ে তৈরি দেওয়ালে ঘেরা মালেক মিয়ার অন্দরউঠান, এই দেয়ালটা তুলতে কয়েক হাজার টুকরি কাঁদা লেগেছে! যার সবটুকুই বয়ে এনেছেন মরিয়ম বেগম। একদিনে এই দেয়াল গড়া হয়নি, বানের জল শুকিয়ে গেলে খাল থেকে কাঁদা তুলে আনতে হয়েছে, মাস দুয়েকে গড়া হয়েছে এই দেয়াল।

রান্নাঘরের যে অংশে দেয়ালটা খানিক ভেঙে পড়েছে জাম গাছটা মোটা হয়ে যাওয়ার ফলে, ওখানে উঠে বসে পা ঝুলিয়ে তুহিনের এই করুণ দশা দেখে মুখটিপে হাসছে রেবতী, চাঁদিনী চাটনির প্যাকেটে আঙুল ঢুকিয়ে সেই আঙুল শৈল্পিক কায়দায় চুষছে আর চোখ পিটপিট করছে।

তুহিনের ইচ্ছে হচ্ছে, লাফিয়ে গিয়ে ওর চুল ছিঁড়তে।হাত গুলো কেমন নিসপিস করছে, ছাড়া পেলে এখনই যে রেবতীর গালে পিঠে কয়েক ঘাঁ পড়বে – সে জানে। রেবতী সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে জিভ বের করে ভেঙচি কেঁটে তুহিনের জ্বালা টা আরো বারিয়ে তোলে।

তুহিনের ছটফটানি দেখে মনে হয়, খাঁচায় বন্দি বাঘ কে মাংসের টুকরো দেখানো হচ্ছে।

রেবতী ছড়া কাটে, ‘তা ধিনা ধিন ধিন বাগে আইল তুহিন।’

রেবতীর এই ছড়াকাটার স্বভাব টা কবেকার আর কিভাবে রপ্ত করেছে তা নিয়ে গবেষণা করেনি গ্রামের কেউ।কথা বলার সময় মেয়েটি সুন্দর করে ছড়াকেটে কথা বলে, এই গুণের জন্যই অনেকে আদর করে ছড়াবুড়ি ডাকে রেবতীকে। তুহিনদের ঘরের পাশের চৌচালা ঘরটি রেবতীদের। সোলেমান মিয়ার অভাবের সংসার, তবুও মেয়ের মুখে চেয়ে সুখ খুঁজে পায় সোলেমান হাসনাবানু দম্পতি।

রেবতী তুহিনের প্রায় সমবয়সী, একটা সময় দুটিতে গলায় গলায় ভাব থাকলেও এখন আর নেই। মোক্তব থেকে শুরু করে স্কুলে, সবখানেই এগিয়ে রেবতী।

পড়াশোনার কারণেই এরা শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে, তবে সেটা যে শুধু তুহিনের ভাবনায়। রেবতী কখনোই তুহিনের সাথে বৈরিতা করে না।

সারাদিন বেঁধে রাখার পর মাঝরাত্তিরে মালেক মিয়ার পিতৃস্নেহ জেগে উঠেছিল বোধহয়, ছেলের বাঁধন খুলে নিজ হাতে গোসল করিয়ে, পাতপেরে খাইয়ে অশ্রুসিক্ত হয়েছে মালেক মিয়া। হাঁটুতে গোড়ালিতে রক্ত জমাট বেঁধে কালো হয়ে গেছে,মলম লাগিয়ে দিয়েছে নিজ হাতে। মরিয়ম বেগম বালিশে মুখচেপে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদেছে অনেক্ষণ। ছেলে ঘুমিয়ে না পড়া অবধি শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন মালেক মিয়া।

মায়ের সখের মোরগটি মাটির খোঁপে জোরসে গলা সাধে-কুক্কুরু কু। মোরগের ডাকে ঘুমভাঙে তুহিনের। বাপ মা দুজনেই উঠে পড়েছে অনেক আগেই, যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।ভাতের হাড়িতে ফ্যান উঠছে, টগবগ করে ফুটছে জল। তুহিন বিছনায় শুয়ে শুয়ে শোনে।

অনেকদিন বাদে বাপ মায়ের বিছনায় ঘুমিয়েছে, মা রাতে কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিল। আরমোরা ভাঙতে ভাঙতে তুহিন জোরে জোরে নিশ্বাস নেয়। হেকিমপুরি জর্দার ঘ্রাণ লেগে আছে কাঁথায়, মা যখন পান চিবোয় তুহিন প্রায়ই মায়ের মুখের কাছে মুখ নিয়ে গন্ধ শোকে- এই গন্ধটাকে তুহিন ‘মা মা গন্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

গতকালকের নির্মম শাস্তির কথা মনে পড়ে যায়, মনে পড়ে রেবতীর কথা। মজা নিচ্ছিল কাল, আজ ওকে সাজা পেতেই হবে। বিছনা ছেড়ে নামতেই হাঁটুর ক্ষততে টান লাগতে মৃদু চিৎকার করে তুহিন।

মা রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে,’কি হইল রে বাপধন?’

তুহিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাইরে আসে, মায়ের উপর চাপা অভিমান জন্মেছে। কাল দুপুরে যখন তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছিল, এক গ্লাস জল নিয়েও আসেনি।

মা তুহিনের কাঁধে হাত রাখে, ‘রাগ হইস না বাপ, তোর বাপজানরে তো জানোস। আমি কাইল সারাদিন একফোটা পানিও খাই নাই বাপ আমার।’

মায়ের চোখ ভিজে উঠতে দেখে তুহিন হাসে, ‘ও মা, আমার কিচ্ছু হয় নাই। বাপজান রাইতে কত আদর করলো আমারে।’

মা আঁচলে চোখ মোছে, ‘বাপ আমার, আর ইস্কুল ফাঁকি দিস না।তোর জন্যে ইচা মাছ ভুনাইছি, খায়া ইস্কুলে যাবি।’

তুহিন আর কথা বারায় না,দাদির ঘরের বেড়া থেকে নিমের দাতন নিয়ে খালপারের দিকে নেমে যায়।

পারের ধানিজমির সেচের জল এসে খালে জমেছে, কচুরির কুচি পানায় সে জল ছেয়ে গেছে। রেবতী হাঁসের বাচ্চাগুলোকে ছেড়ে দিয়ে জলে পা চুবিয়ে বসে আপন মনে ছড়াকাটছে, ‘যা রে উইড়া শঙ্খচিল নয়তো খাবি একটা ঢিল।আমার হাঁসের কচিছানা আহ্লাদে খায় কচুরিপানা তা ধিন ধিন তা না না….।’

তুহিন পা টিপে টিপে নেমে এসে একেবারে রেবতীর পিছনে দাঁড়ায়। অতর্কিত হামলা মোকাবেলার প্রস্তুতি না থাকায় পানাজলে লুটিয়ে পড়ে। মাথা তুলতেই দেখে তুহিন কেটে পড়েছে ,পিঠে আঁচর লেগেছে নখের! নাক থেকে রক্ত ঝরছে। ফ্রকের পিঠ ছিড়ে গেছে, নোংরাজল লেগে জ্বালা করেছে খুব। ফুঁপিয়ে কাঁদতে গিয়েও কাঁদে না রেবতী।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী গেদুরমা বুড়ির চিৎকারে পাড়ার মানুষ এসে জরো হয় খালপারে। রেবতীর পানাজলে মাখামাখি ঘায়েল দশা দেখে প্রশ্নাত্মক চোখ গুলো মুখচাওয়া চাওয়ি করে। গেদুরমা বুড়ির বর্নণায় তুহিন দোষি সাব্যস্ত হয় সকলের কাছে। সোলেমান দক্ষিণিচকের জমিতে ঘাসকাটতে বেরিয়েছিল, মেয়ের উপর হওয়া হামলার ঘটনা শুনে তেড়েফুঁড়ে আসে। অকথ্য গালিগালাজে মালেক মিয়ার চৌদ্দপুরুষকে খুনি বদমাইশ প্রমাণ করে, এবং এর একটা সুবিচার প্রার্থনা করে উপস্থিত জনতার কাছে।

মরিয়ম বেগম হেসেলে লাউশাক ভাজি করছিল, গেদুরমার চিৎকার আহাজারি শুনে তা ফেলেই খুন্তি হাতে চলে এসেছে। ঘটনার আসন্ন ফলাফল যে ভয়ঙ্কর ঘটতে চলেছো তা ভেবেই বুকের মধ্যে মোচড় মেরে ওঠে। সন্ধ্যায় কর্তা ফিরলে নির্ঘাত নালিশ নিয়ে আসবে সোলেমান। তারপর আবারো তুহিনের উপর নেমে আসবে শাস্তির খড়্গ। রেবতীকে জল থেকে তুলে আনে মরিয়ম বেগম, দুধেআলতা শরীরে জখম গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এরই মধ্যে!

ছেলের নিষ্ঠুরতা দেখে চমকে ওঠে মরিয়ম।

হাসনাবানু কোমরে আঁচল গুঁজে নেমে এসে মেয়েকে কেড়ে নেয় যেন, ‘দরদ দেখাইতে অইব না, পোলায় মারছে আর মা আইছে মলম লাগাইতে।’ হাসনাবানুর কথা শুনে কাল বিলম্ব করে না মরিয়ম বেগম, মুখে আঁচল চেপে দ্রুত বাড়ি ফিরে যায়।

সেই সকালে লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি তুহিন। সারাদিন এখানে ওখানে ঘুরে বেরিয়েছে, পা আর চলছে না এখন।

সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাড়ি ফিরবে না আর, ধুলিয়া আটার সুবিশাল মাঠের মাঝখানে একটি কবর, কবরের উপর ঝাঁকরা হিজল গাছটির চারদিক ঘিরে আছে নানান আগাছা পরগাছা লতা গুল্মে। কেউ আসে না এদিকটায়।এইখানেই লতাপাতা দিয়ে ছাউনি বানিয়ে থাকা যাবে, রাতে গ্রামে ফিরে খাবার চুরি করে এনে খেয়ে বেশ কাটবে দিন। বাপজানের অত্যাচার, মাস্টারের বেত্রাঘাতের থেকে এই ভালো।

পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়াই ছিলো তুহিনের, জুতার বাক্সে নানান জিনিস এনে জরো করেছে আগে থেকেই। দেয়াশলাই, অর্ধেকটা জ্বলা মোমবাতি, একটা চাকু, অনেকগুলো সাদা দিস্তা কাগজ- যে গুলো পরীক্ষার দিন অতিরিক্ত খাতা নেওয়ার নাম করে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে জামার তলে গুঁজে নিয়ে এসেছে। তুহিনের মতে ছবি আঁকার জন্য শ্রেষ্ঠ কাগজ হলো পরীক্ষার খাতা।

হাতের লেখা লিখে এই কাগজ নোংরা করার কোনো মানেই হয় না, সহপাঠীদের মধ্যে হাতের লেখা যাদের বাজে ধরনের, তারা যখন লিখতে থাকে – তা দেখে তুহিনের খুব কষ্ট হয়।

অনেক্ষণ খেটেখুটে লতাপাতা দিয়ে বেশ একটা ছাউনি বানিয়ে ফেলেছে তুহিন,ঘাস দিয়ে বিছানা। এবার একটু আরাম করে নেওয়ার পালা, সূর্যমামা খাঁপাড়ার বাঁশবনের আড়ালে চলে গেছে এতক্ষণে।

তুহিন আয়েশি কায়দায় ডানপায়ের হাঁটু ভাজ করে তার উপর আর এক পা তুলে দোলাতে দোলাতে চক্ষুবোজে, মায়ের মুখটা ভেসে ওঠে। দাদির তুলতুলে চামড়ার উষ্ণতার কথা মনে পড়ে যায়। এখন বাড়িতে থাকলে শয়তান রেবতীর গলা ছেড়ে পড়ার আওয়াজ শোনা যেত। রাগ হয় তুহিনের; কি দরকার আছে অত জোরে জোরে পড়ার? সবই চক্রান্ত ওর, যেন ওর পড়া শুনে বাপজান ভাবে, মেয়েটি কি ভালো- পড়াশোনা করে।

ওর পড়া শুনেই তো বাপজান এসে চেপে ধরে তুহিনকে, বলে ‘দেখ, রেবতীর পড়া দেখে কিছু শেখ।’

মনে পড়ে যায় সকালের ঘটনা, বড্ড বেশি মারা হয়েছে। ভেবে একটু যেন অনুতপ্ত হয় তুহিন।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে অনেক্ষণ, একদম কানের পাশেই এক ঝাঁক ঝিঁঝিঁপোকা সমানে ডেকে চলেছে, এক দুই তিন দলে ভাগ হয়ে ডাকে ওরা, একদল থেমে গেলে অন্যরা ডাকে- সারারাত চলতেই থাকে।

পাশের ধানক্ষেতের আলধরে একটা শেয়াল দৌড়ে আসছিল, তুহিনের নড়াচড়া টের পেয়ে থমকে দাঁড়ায়। অন্ধকারে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। বাড়ির সাদা বিড়ালটা রাতে যখন চৌকির তলায় বসে থাকে, ওর চোখও এমন জ্বলজ্বল করে।

তুহিন কয়েকবার হুস হুস করতেই যে পথে এসেছিল সে পথেই ফিরে যায় শেয়াল পণ্ডিত।

প্রচণ্ড ক্ষুধায় তেষ্টায় ঘুম আসছে না তুহিনের, তার উপর ইয়া বড় বড় মশা! তবুও সে অনড়। যা কিছুই ঘটুক, ফেরা চলবে না। বাড়িতে ফিরে বাপজান এতক্ষণে কঞ্চি তৈরি রেখেছে নিশ্চয়ই, নাগালে পেলেই সপাংসপাং!

রাত গভীর হতে থাকে, সাথে কি এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।

কিছুক্ষণ আগেও মানুষের অস্পষ্ট কথার ধ্বনি ভেসে আসছিল বাতাসে। দূরে সুবর্ণপুরের রাস্তায় দুটো একটা ভ্যান রিকশার ক্রিংক্রিং বেল বাজা শোনা যাচ্ছিল।এখন আর মনুস্যসৃষ্ট কোনো শব্দের টুংটাং টি শোনা যাচ্ছে না।রাত এখন নিশাচরদের দখলে, এই মুহূর্তে এ ভূখণ্ডের কর্তৃত্ব ছেড়ে দিয়েছে মানুষ।

প্রচণ্ড রকমের অস্বস্তি হচ্ছে তুহিনের, শরীরের শেষটুকু দিয়ে লড়াই চালিয়েছে এতক্ষণ। চোখের সামনে কেমন সব টিপটপ করছে, অন্ধকার আর অন্ধকার থাকছে না- কেমন দপ করে আলোকিত হয়ে উঠছে চারদিক।আবার অন্ধকার, আবার আলো! ঝিঁঝিঁর দল মনে হয় মাথার মধ্যে একেবারে মগজের ফাঁকফোকরে ঢুকে গিয়ে এক নাগাড়ে ঝিঁঝিঁঝিঁ শব্দ করছে।

তুহিন আপন মনে কথা বলতে শুরু করেছে; আমি কি মইরা যাইতাছি?

– হ, মরবিই তো – অক্ষণি মরবি।

– আজরাইল দেখতে কেমন?

– আজরাইল দেখতে আলোর মতো, ফকফকা।

– আলো হইলে মানুষ ডরায় ক্যা?

– আজরাইল হইল পরীক্ষার খাতার মতো সাদা, সব খারাপ কামকাজের ছবি আঁকা হয় তাতে। তাই দেইখা মানুষ ডরায়।

– তুই খারাপ কাজ করস নাই?

– করছি, স্কুল ফাঁকি দেওয়া খারাপ কাজ। রেবতীকে মাইর দেওয়া খারাপ কাজ, বাপজানের কথা না শোনাও খারাপ কাজ।

– আর মায়ের কথা না শোনা?

– মায়ের কথা না শোনাও খারাপ, কিন্তু কম খারাপ।

– কেন?

– মা তো বেশি ভালোবাসে,তাই।

– ও।

– মারা যাওয়ার সময় বেশি কথা কইতে হয় না, চুপ থাকতে হয়-না হয় আল্লাহর কথা স্মরণ করতে হয়।

তুহিনের চোখের পাতায় পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি এসে ভর করে, কিছুতেই আর চোখ পুরোপুরি মেলা সম্ভব হচ্ছে না। দূরে টর্চের আলোর মতো কিছু একটা এগিয়ে আসতে থাকে, নিশ্চয়ই আজরাইল। ক্রমেই সে আলো কাছে চলে আসছে। চেনা কণ্ঠস্বর, কান্নার আওয়াজ কানে আসছে। সে আওয়াজ নিকট থেকে নিকটতর হয়। তুহিন সম্বিৎ হারিয়ে ফেলেছে।

ভোরের আলো ফুটেছে অনেক্ষণ, এখনো জ্ঞান ফেরেনি তুহিনের। ধুলিয়া আটার মাঠের গোরস্থান হতে উদ্ধার করে আনার পর থেকে একটি বারও চোখ মেলেনি। রাতেই গঞ্জ থেকে নরেন্দ্রনাথ ডাক্তারকে ডেকে এনেছিলেন মালেক মিয়া। ডাক্তার বলেছে ভয়ের কিছু নাই, স্যালাইন লাগিয়ে দিয়ে গেছে। না খেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ায় এমনটা হয়েছে, সাথে জ্বরের ওষুধ দিয়ে গেছে- তিন বেলা খাওয়াতে হবে।

মালেক মিয়ার চোখে ক্রোধ নেই, আছে কেবলই পুত্রস্নেহ। মৌলভীসাহেবকে ডাকতে গেছে মালেক মিয়ার ছোটভাই খালেক। এখনো আসছে না দেখে বাহিরের উঠানে উঁকি মারে মালেক মিয়া। তুহিনের শিয়রে বসে জলপট্টি লাগাচ্ছে মরিয়ম বেগম, সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেননি তিনি।

দাদি সায়রাবানু মেঝেতে জায়নামাজ বিছিয়ে বসেছে সেই রাতে। নাতির সুস্থতা কামনায় শ’রাকাত নফল নামাজ আদায় করে ঘুমিয়ে পড়েছে জায়নামাজেই।

জানালায় এসে দাঁড়িয়ে উকি মারে রেবতী। মরিয়ম রেবতীকে ইশারা করে ঘরে আসতে।

রাতে যখন পাগলের মতো সবাই তুহিন কে খুঁজছিল, কোথাও কোনো হদিশ মিলছিল না। তখন রেবতী চুপিচুপি এসে মরিয়ম বেগমের কানে কানে বলেছে তুহিনের গোপন আস্তানার কথা। তা না হলে যে কি হতো, হয়তো তুহিনকে শেয়াল কুকুরেই খেয়ে নিতো। ভাবতেই কেমন বুকটা কেঁপে কেঁপে উঠছে মরিয়মের। রেবতীর কাছে মনে মনে হাজার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মরিয়ম।

রেবতীকে ডাকে, ‘অই ছড়াবুড়ি ভেতরে আয়।’ মরিয়মের ডাকে না সুচক মাথা নেড়ে জানলা থেকে সরে যায় রেবতী।

মৌলভীসাহেবকে সাথে নিয়ে ঘরে ঢোকে মালেক মিয়া, মৌলভীসাব এক গ্লাস জল আনতে বলে বিছানায় বসে দোয়া দরুদ পড়ে তুহিনের কানে তিনবার ফুঁ দেয়, একটু যেন নড়াচড়া করে তুহিন।

মালেক মিয়াকে পাশে ডেকে নিয়ে মৌলভীসাহেব বলেন, ‘ভাইসাব, আপনার ছেলের উপর খারাপ নজর আছে।ওরে দিনের পথে দিয়া দেন, ইনসাল্লাহ তিনিই ওর হেফাজত করবেন।’

মালেক মিয়া ভীরুকণ্ঠে সবিস্তরে জানতে চায় কি করণীয়।

মৌলভী বুঝিয়ে বলেন, ‘ওর মনে কোরান কালামের বাণী নাই, অন্তর আত্মা বিশুদ্ধ করতে হাফিজিয়া (কউমি) মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেন। উশৃঙ্খলতা দূর হবে, আখেরে সপরিবারের বেহেস্তের টিকেট ও দিতে পারবে দশপাড়া কোরানের হাফেজ হয়ে।’

জলের গ্লাস হাতে মরিয়ম বেগম দরজায় দাঁড়িয়ে সব শোনে। কিছুতেই ছেলেকে কউমি মাদ্রাসায় পাঠাবেন না তিনি। অন্যের বাড়িতে জায়গির রেখে দিতে হবে ছেলেকে। তা ছাড়া কউমি মাদ্রাসা আলোকদিয়া গ্রামে, সে বহুদূর। ছেলেকে চোখের দেখা দেখতেও পাওয়া যাবে না।

মৌলভীসাব জলের গ্লাস নিয়ে বিড়বিড় করে দোয়া পাঠ করে তিন ফুঁক দিয়ে গ্লাসটা রেখে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, ‘এই পানি এট্টু পরপর খাইয়ে দিতে হবে, ইনসাল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে। আসি ভাইসাব, আস্লামু আলাইকুম।’

মৌলভীসাবকে বাহির উঠান পর্যন্ত এগিয়ে দেয় মালেক মিয়া।

দুপুরের দিকে ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে তুহিনের, স্নানাহার করিয়ে মাথায় যবুথবু করে সরষের তেল লাগিয়ে দিয়েছে মা। একটি রাতই তুহিনের সব দুরন্তপনা কেড়ে নিয়েছে যেন, কেমন শান্ত মৌনভাব নিয়ে খালপারে বসে আছে তুহিন। তুহিনের মনজতেগের সাথে প্রকৃতিও কেমন তাল মিলিয়েছে।আকাশে মেঘের আনাগোনা, কেমন থ হয়ে আছে সব কিছু।

গাছের একটি পাতাও নড়ছে না, ওপারে ধুলিয়া আটার মাঠের বুক উপচে পড়েছে ধানে। সবুজ সোনার ধান,ধান ক্ষেত থেকে উড়ে আসছে শালিকের ঝাঁক।

ঝগড়া করছে দুটো ফিঙে, ক্ষেতে পোঁতা কঞ্চিতে বসে।

মোস্তাহাব ব্যাপারীর তিনটে আম গাছ খালের ওপারে। নয়ন চারদিকটা ভালো করে দেখে নিয়ে এক দৌড়ে খাল পেরিয়ে আমগাছ তিনটির ফাঁকে মিলিয়ে যায়, বেশ খাওয়ার উপযোগি হয়েছে আমগুলো। তুহিনের একটিবার ইচ্ছেও করছে না নয়নের সাথে গিয়ে আম চুরিতে সামিল হওয়ার।

চোখ ফিরিয়ে নেয় তুহিন,খালের জলে রেবতীর হাঁসের বাচ্চারা মনের আনন্দে ঝপাঝপ ডুব দিচ্ছে, বেশিক্ষণ জলের তলায় থাকতে পারছে না।বড় হলে নদীর তলদেশ থেকে শামুক কুড়িয়ে খাবে ওরা এক ডুবে, তার প্রশিক্ষণ চলছে এখানে।

রেবতী হাঁসের বাচ্চা নিতে এসে তুহিনের পিছনে চুপটি করে দাঁড়িয়েছে কখন টেরও পায়নি ও। তুহিন আলোকদিয়ায় চলে যাবে, এ খবর পাড়াপড়শিরা বলাবলি করছে। অনেকেই তো স্বস্তির নিশ্বাস নিচ্ছে বুক ভরে তুহিনের গ্রাম ছাড়ার খবর শুনে।

কম তো আর জ্বালায়নি পড়শিদের, গেদুরমা বুড়ির পেয়ারা গাছের পেয়ারা থাকে না। আইজউদ্দির উঠানের ফজলি আমগাছে গেলবার প্রথম প্রথম একছড়ি আম ধরেছে। কি যে খুশি হয়েছিল আইজউদ্দি, কত যত্ন নিতো সে আমের। প্রথমবার ফল ধরলে সেই ফল চুরি গেলে গাছ বন্ধা হয়ে যায়।

তাইতো রাতেও গাছতলায় পাটি বিছিয়ে ঘুমাত সে। আমে রং চরে, বৈশাখের এক রাতে তুমুল ঝড়বৃষ্টি শুরু হলে ঘরে আশ্রয় নেয় আইজউদ্দি। সেই সুযোগে সবকটি আমই ছিঁড়ে নিয়ে যায় কে বা কারা। ঝড় শেষে আমগুলো দেখতে না পেয়ে আইজউদ্দি মরা কান্না জুড়ে দেয়, অমন কান্না বাপ মা মরে গেলেও কেউ কাঁদেনি।

সকালে নয়নদের উঠানে আমের ছোকলা দেখতে পেয়ে গেদুরমা বুড়ি আইজউদ্দির কানে দেয় কথা টা।তারপরই শুরু হয় নয়নের বাপের সাথে আইজউদ্দির বিবাদ, নয়নকে জেরা করা হয়।তদন্তে বেরিয়ে আসে, তুহিনের বুদ্ধিতে নয়ন আর তুহিন মিলে ঝড়ের সময় আম চুরি করেছে।

গেদুরমা বুড়ির এহেন চক্রান্তের শোধ তুলতে বুড়ির গায়ে বিচুটি পাতার গুড়ো ছড়িয়ে দেয় তুহিন। গরমের দুপুরে বুড়ি তার ভাঙাঘরের মেঝেতে মাদুর পেতে শুয়েছে, বুড়িমানুষ -ব্লাউজ পরে না।কোনো মতো কাপড় প্যাঁচ মেরে রাখে, সারা শরীরে বিচুটিপাতার চুলকানি থামাতে পানাপুকুরে নগ্ন হয়ে নামতে হয়েছিল তাকে।

এমন সব অত্যাচার থেকে মুক্তি মিলতে চলেছে পাড়ার লোকেদের। রেবতীরও খুশি হওয়ার কথা, শরীরে তুহিনের নখের আঁচরের নতুন পুরান দাঁগগুলোই বলে দেয় অত্যাচারিত রেবতী।

পুতুলবিয়ের আয়োজন ভেঙে দিয়ে তুহিন কি পৈচাশিক আনন্দই না করেছে, গেল বৈশাখী মেলায় বাপের সাথে মেলায় গিয়ে ক’গোছা লাল টুকটুকে কাচের চুড়ি কিনেছিল রেবতী। মোক্তবে তুহিন পড়া পারেনি, রেবতী পেরেছে এই অপরাধে মোক্তব শেষে জুম্মাবাড়ির গড়ান নামার সময় মারামারি বাঁধায় তুহিন। রেবতীর হাত চেপে ধরতেই পটপট করে ভেঙে যায় সব চুড়ি। বাড়িতে এসে রেবতী অবশ্য নালিশ করেনি মাকে, উল্টো কাঁদোকাঁদো হয়ে মিথ্যে বলেছে ‘গড়ান নামতে গিয়ে পড়ে গিয়ে সব চুড়ি ভেঙে গেছে।’

মায়ের দেওয়া অলক্ষ্মী কুলাটা মেয়ের খেতাব মাথাপেতে নিয়েছে রেবতী। তুহিন আলোকদিয়া চলে যাবে ভেবেই কেমন মন খারাপ হয়েছে রেবতীর। চুপটি করে তুহিনের পাশে বসে রেবতী, হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে। তুহিন পাশফিরে তাকায়, কি এক কাতরতা সে দৃষ্টিতে, কি এক প্রগাঢ় অনুশোচনা। রেবতী তুহিনের চোখের ভাষা বুঝতে পারে, ‘কবে যাবি?’

তুহিন কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে রেবতীর মুখে, রেবতীর চোখ ছলছল করছে- এক্ষণি যেন কেঁদে ফেলবে।

তুহিন হাঁসের বাচ্চাদের দিকে দৃষ্টিফিরিয়ে কথা বলে, ‘বাপজান আলোকদিয়া গেছে সব ঠিকঠাক করতে। আমারে জায়গির রাখবো যে বাড়িতে অই বাড়ির লোকেদের সাথে কথা বলতে।’

– তুই পারবি?

– কি?

– আমাদের ছাইড়া থাকতে?

তুহিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে-, ‘পারমু না ক্যা? তোরা তো আমারে দেখতেই পারস না,খুব পারমু।’

তুহিনের অভিমানি কণ্ঠস্বর, রেবতী কথা না বারিয়ে আস্তে আস্তে হাঁসেদের কাছে নেমে যায়। ছড়াকাটে -‘যা রে উইড়া পরাণ পক্ষি ঘুরবি আলেডালে, তোমার আমার ছাড়াছাড়ি এইনা গ্রীষ্মকালে।’

তুহিন উঠে বাড়ির দিকে রওনা হতেই নয়ন দৌড়ে আসে, কোছ ভরে নিয়ে এসেছে আম, কস লেগে লুঙির দফারফা হয়ে গেছে।

তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করে নয়ন, ‘তু.. তুই কাইল চ..চইলা যাবি দেইখা এই আমগুলো আ..আনছি, সাথে নিয়া যা..বি।’

তুহিন নয়নের কথায় ভ্রুক্ষেপ না করেই বাড়ির দিকে চলে যায়। রেবতীর কাছে নেমে গিয়ে নয়ন কয়েকটা আম দিয়ে মাঠের দিকে হাঁটে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে এতক্ষণে, টুকরিতে হাঁসের ছানাগুলোকে তুলে ছড়াকাটতে কাটতে বাড়ির পথ ধরে রেবতী, ‘সইন্ধ্যার কালে আসমানেতে হাঁসে শুকতারা, আমি একলা কেমনে থাকমু বন্ধু তোমায় ছাড়া।’

আইজউদ্দির বাড়ির নিচে ঝোপঝাড় পেরিয়ে গেলেই রেবতীদের উঠান, ঝোপঝাড়ে জোনাকিরা জ্বলে উঠেছে, হিজল গাছের নিচ দিয়ে  লাঠিভর করে পা টিপেটিপে হেঁটে যাচ্ছিল গেদুরমা বুড়ি, রেবতীর দরদমাখা কণ্ঠের ছড়ারগীত শুনে অন্ধকারের ভেতর হতে ডাকে, ‘ও লো ছড়াবুড়ি, মনে রং লাগছেনি তোর?’

রেবতী আকস্মাৎ বুড়ির ডাকে চমকে উঠলেও একটু যেন লজ্জা পায়- ‘কি যে কও না চাচি, আমার কি বয়স হইছে।’ বলেই বাড়ির দিকে ছুট লাগায়।

মালেক মিয়া রাতে ফিরেই তুহিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাক্সে ভরেছে। কাপড়জামা, দুইখান কাথা, একটা বালিশ নিয়ে বড় একটা পোটলা বেঁধেছে। বিকেলে ঝড়বৃষ্টির আশঙ্কা অমূলক নয়, তাই সকাল সকাল বেরিয়ে পড়াই ভালো ভেবেই গুছিয়েছে সব।

মরিয়ম বেগম সেই ভোরে উঠে ছেলের জন্য রান্নাবান্না করেছে, আজকের প্রত্যেকটি খাবারে মিশেছে তার অবাধ্য অশ্রু। তুহিন দাদির বিছনায় চুপটি করে বসে আছে, বিছনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এতদিনের আঁকা ছবিগুলো। মাছরাঙার ঠোঁটে পুঁটি মাছ,পানকৌড়ির ঝাকের আড়ালে লালাভ সূর্য টা কিংবা দড়িখেলারত বালিকার ছবিটা হয়তো কোনো আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শনীর জন্য আঁকেনি তুহিন। শহুরে শিশুকিশোরদের যেমন প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থাকে, গ্রামে সেটা মেলে না, আর চাষাভুষারা শিল্পের কি বোঝে-এরা তো আদতে একেজন শিল্পীই। রুক্ষ জমিন চষে কি মনরম ফুল ফসলের ছবিই না আঁকে।

তুহিনের এরকম অসংখ্য ছবি, যার বিশেষত্ব হলো প্রকৃতির রং; সবুজ পাতা, লাল- হলুদ-গোলাপি ফুল, কাঠ কয়লা এবং বিভিন্ন লতাগুল্মের ফল- বীজ ঘষে নিয়ে এঁকেছে ছবি গুলো। গ্রামের এক সাধারণ বালকের সখের আঁকা আঁকির খবর রাখার দরকার নেই কারো। বরং ওর এই আঁকা আঁকি বিদ্যা শিক্ষা অর্জনের পথে অন্তরায় হিসেবেই চিহ্নিত হোক।

আমাদের বিদ্যার্জন কেবল গোলাম হওয়ার জন্য, পাশ কর -বড় মানুষ হও। মহামনীষীদের কতজন যে বিদ্যালয়ের চৌকাঠ ই পেরোয়নি, সে মহাজীবনী পাঠ করে আমরা শিক্ষিত হই, লেটার মার্কস পাই। আদৌ আমরা তার থেকে কিছুই শিখি না, আমাদের কেবল শেখানো হয় তাদের জন্ম মৃত্যুর তারিখ- ব্যাস, এটুকু মনে রাখলেই চলে।

ছবিগুলোর একটা গতি করতে হবে, তুহিনের ভাবনা জুড়ে এখন এটাই। রেবতীর কাছে ছবি গুলো দিয়ে গেলে মন্দ হয় না। যাওয়ার আগে ওকেই সব কিছু দিয়ে যাওয়া যাক। এখন ওকে ডাকতে যাওয়া মুশকিল, দাদিকে পাহারায় রাখা হয়েছে – যাতে পালিয়ে না যায় তুহিন।তা ছাড়া হাসনা কাকি রেগেও আছেন বোধহয়, মেয়েকে অমন মারের পর মায়ের রাগ টা স্বাভাবিক।ভেবে আর পা বারায় না তুহিন।

মালেক মিয়া তাড়া দেয়, ‘কই রে বাপ বাইর হ, ল যাই। তোরে রাইখা আবার ফিরতে হইব আমার।’

রেবতী এসেছে, হাসনা কাকি পিঠা বানিয়ে পাঠিয়েছে। রেবতীর হাত ধরে টেনে নিয়ে দাদির ঘরে ঢোকে তুহিন। তুহিনের যাবতীয় সম্পদ তুলে দেয় রেবতীর হাতে, রেবতী কথা বলে না- কেমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখে তুহিন কে।

তুহিনের চোখ ভিজে উঠেছে, কান্না আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করে তুহিন।

মালেক মিয়া আবার ডাকে, ‘কই রে, তাড়াতাড়ি আয়।’

তুহিন পা বারাতেই রেবতী হাত টেনে ধরে, ‘আসবা কবে?

তুহিন ‘জানি না। ভালা থাকিস রে।’

বিদায়পর্ব দীর্ঘ করে না তুহিন, চোখ মুছতে মুছতে উঠানে এসে দাঁড়ায়, হাসনা কাকি, মা এবং দাদির চোখ ছলছল করছে। তুহিনের মনে একটুও মায়া জাগলো না সবার সজলনেত্র দেখে। বরং রাগ হচ্ছে, কেউ ভালোবাসে না ওকে- এটাই মনে হচ্ছে কেবল। দাদি এসে মাথায় স্নেহের হাত বুলাতেই লাফিয়ে সরে যায় তুহিন, চিৎকার করে,  ছুঁবি না বুড়ি।’

মরিয়ম হু হু করে কেঁদে উঠতেই তুহিন তাড়া দেয়, ‘বাপজান, আমারে তাড়াতাড়ি রাইখা আইসো।’ বলেই বেরিয়ে যায় খালপারের রাস্তায়, বড় রাস্তায় গিয়ে ভ্যানে চরতে হবে। ভ্যান থেকে কদমতলি নেমে সিএনজিতে আলোকদিয়া বাজার, দশ কিলোমিটারের পথ। বাজার থেকে হাঁটাপথে গ্রামের ভেতর দুই কিলোমিটার গেলেই কবরস্থানের পাশে আলোকদিয়া নূরানি হাফেজিয়া মাদ্রাসা। তুহিনের আসন্ন দিন রাত্রির ঠিকানা হতে চলেছে এখানেই।

আলোকদিয়ায় পূর্বপাড়ার রসুল মোল্লার বাড়িতে তুহিনের তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মাদ্রাসা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রামের স্বচ্ছল পরিবারগুলোতে বাধ্যতামূলক ভাবে দূর গ্রামের একজন করে ছাত্রকে জায়গির রাখার নির্দেশ দেওয়া আছে। জায়গিরকে দিয়ে টুকিটাকি কাজ করিয়ে নেওয়া যায়, যেমন-বাজার সদাই করা, গৃহপালিত পশুটির যত্ন নেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। তাছাড়া এটা যে সোয়াবের কর্ম, এ বিষয়ে প্রত্যেকবছর মাদ্রাসার উন্নয়নের লক্ষ্যে আয়োজিত ধর্মসভার বক্তারা বক্তব্য রাখেন।

একজন ত্রিশপাড়া কোরানের হাফেজের হাত ধরে বেহেস্তে যাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করা বোকামি। আখেরে লাভ আর ইহকালের চাহিদা মেটানোর লোকের অভাব হয়না আলোকদিয়ায়।মোল্লাবাড়িতে আগেও কয়েকজন থেকে গেছে, বদনাম করে গেছে যারা গেছে। মোল্লার স্বভাব ভালো না, মোল্লার ছেলে মেয়েরা বড্ড বেশি কাজ করিয়ে নেয়, হাত ও তোলে। এমন সব অভিযোগের তোয়াক্কা করেনি মালেক মিয়া।

সপ্তাহ কেটে গেছে আলোকদিয়ায়। তুহিনের প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়, চোখের তলে কালি পড়ে গেছে।জ্বর হয়েছিল বৃহস্পতিবার রাতে, সারারাত প্রলাপবকছে। রাতে ঘুম হয়না ভালো, মাঝরাত্তিরে চোখ বন্ধ করতেই অন্ধকারে দু-একজনের হাঁটাচলা টের পায় তুহিন। ফিসফিস করে কথা বলা কানে আসে। রহস্যের গন্ধ পেয়ে সজাগ থাকে তুহিন।

রহস্যের কুলকিনারা করতে পারে না তবুও।

ফজরের আজানে সবাইকে ডেকে তোলে ছোট হুজুর, তারপর ওযু সেরে নামাজের পালা। নামাজ শেষে আমপাড়া ছন্দে ছন্দে দুলেদুলে পড়ে তুহিনের মতো নতুনেরা। বড়রা কোরাআন তিলায়ত করে। সকালে বাংলা ইংরেজি অংক।

তারপরই ছুট দেওয়া টিফিন ক্যারিয়ার হাতে মোল্লাবাড়িতে। অনেকটা পথ সহপাঠীদের সাথে হেঁটে আসে, তুহিন কারো সাথে কথা বলে না। গ্রামের ব্রিজে অবদি এসে যে যার জায়গিরদারের বাড়িতে চলে যায়। বাড়ি ফিরেই গরু দুটিকে মাঠে আটকে রেখে এসে গোয়াল ঘর ঝাড়ু দেওয়া, উঠান পরিস্কার করা, মোল্লার বউ রহিমা খালার হাতের কাজে সহযোগীতা শেষে গোসল সেরে বাজারে ছোটা। বাজার করে এনে দিয়ে তবেই চারটে খেয়ে দুপুরের জন্যে টিফিন ক্যারিয়ার ভরে মাদ্রাসায় ফেরা, ফিরতে দেরি হলেই বড়হুজুরের বেত্রাঘাত।

মালেক মিয়া তিনদিন আগে এসে দুটো পাজামা পাঞ্জাবি দিয়ে গেছে তুহিনকে, একটা সাদা একটা নীল, গোড়ালি অবদি বিস্তৃত পাঞ্জাবিকে বলে জোব্বা। এই পোশাক তুহিনের মোটেও পছন্দ না, ইচ্ছের বাইরে সব করতে হচ্ছে।

বাজার থেকে ফিরে খেতে বসেছে তুহিন, ঠিক তখনই ডাকে মোল্লার ছেলে শিহাব।

তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠে যায় শিহাবের ঘরে। বিশ টাকার একটা নোট এগিয়ে দিয়ে তিনটে নেভি সিগারেট আনতে বলে শিহাব। আজকে এমনিতেই বেলা হয়ে গেছে বাজার থেকে ফিরতে, এখন দৌড়ে মাদ্রাসায় গেলেও বড়হুজুরের বেত্রাঘাতের থেকে রক্ষা নাই। তার উপর সিগারেট আনতে গেলে কপালে খারাবি জুটবে। অস্বীকৃতি জানাতেই সপাটে একটা চড় এসে পড়ে তুহিনের গালে, পাঁচটা আঙুল কষে গেছে।

টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে ধাক্কা খায় দরজার কপাটে, চড়ের আঘাতের থেকে কপাটের কিনারে মাথা ঠুকে বেশি লেগেছে। দৌড়ে বেরিয়ে যায় তুহিন, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। দেরি করা চলবে না, বড়হুজুরের বেত্রাঘাত না খেতে চাইলে ছুটতে হবে এখনি।

কপালের লেখন কে করে খণ্ডন, হুজর যেন তুহিনের অপেক্ষায় বারান্দায় বসে দাড়িতে তা দিচ্ছিলেন এতক্ষণ।তুহিন দৌড়ে এসে হুজুরকে সালাম দেয়, হুজুর চক্ষু বড় বড় করে উঠে দাঁড়ায়।

তুহিন জানে কি হতে চলেছে,খপ করে দানবিক বাম হাতটা এসে খামচে ধরবে তুহিনের চুলের মুঠি,তারপরই শুরু হবে প্রহার।

কতজন যে বাপ রে মা রে করে চিৎকার করেছে হুজুরের বেত্রাঘাতে, শুধু তুহিন বাদে। গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে প্রহার করেও আজ অবধি তুহিনকে কাঁদাতে পারেনি হুজুর। আজকেও কাঁদছে না তুহিন, তুহিনকে বেত্রাঘাত করার সময় সবাই পড়ার ফাঁকে আড়চোখে চায়, নিজেদের মাংসপেশি কেঁপে কেঁপে ওঠে। তুহিন একটুও কাঁদে না, একফোটা জল ও জমে না চোখে।

দুপুরে সবাই খেতে বসেছে, তুহিন নিজের জায়গায় বসে আপন মনে আমপাড়ার পৃষ্ঠায় আঁকিবুকি করছে।

টিফিনক্যারিয়ার ফেলে আসায় দুপুরে আজ খাওয়া হবে না, এদিকে খিদেও পেয়েছে প্রচণ্ড। কি করতে কি করছে, আর তার পরিনাম কি হবে সে খেয়ালও নেই এখন ওর। তুহিনের পাশের ছেলেটির নাম মুখলেসুর।মুখলেসুর তুহিনের কাণ্ড দেখে হুজুর কে ডাকে, বড় হুজুর কি এক কাজে বাইরে গেছে। ছোটহুজুর তুহিনের আমপাড়া কেড়ে নিয়ে দেখে মানুষের অবয়ব এঁকেছে। ‘কি সর্বনাশ,পবিত্র পৃষ্ঠায় ছবি এঁকেছে – নাউজুবিল্লাহ! ‘এর বিচার বড় হুজুর এসেই করবে বলে রগরাতে রগরাতে বাইরে আসে।

বেশ কিছুক্ষণ বাদেই ডাক আসে তুহিনের, মুখলেসুর এসে খবর দেয়, ‘বড় হুজুরের ঘরে তোরে ডাকে।’

তুহিন বড় হুজুরের কামরায় ঢুকে সালাম দেয়, ‘আস্লামু আলাইকুম।’

হুজুর বিস্ফোরিত চোখ নিয়ে জিজ্ঞেস করে-

– তুই আমপাড়ায় ছবি আঁকছিস কেন?

মাথা নিচু করে জবাব দেয় তুহিন, ‘মনের ভুলে।’

– ছবি আঁকা হারাম জানো না?

– ছবি আঁকা হারাম কেন?

তুহিনের পাল্টা প্রশ্নে খেপে যায় হুজুর-

– থাপরায়া দাঁত ফেলায়া দিমু, মুখে মুখে তর্ক কর!

– আপনে ছবি তোলেন নাই কোনোদিন?

হুজুর একটু থতমত খায়, ‘হ তুলছি, তো কি হইছে?’

– ছবি আঁকা হারাম হইলে ছবি তোলাও তো হারাম।

– তুই আমপাড়ার পৃষ্ঠায় ছবি আঁকলি কেন?

– মনের ভুলে আঁকছি।

– মন কই থাকে তোর?

– ছবিতে।

– ছবি আঁকা হারাম, ছবিতে তোর মন থাকবে কেন শয়তানের বাচ্চা?

– আপনেও তো ছবি আঁকেন।

তুহিনের কথায় হুজুরের মাথা খারাপ হওয়ার জোগার!

– আমি ছবি আঁকি?

– আঁকেন’ই তো।

সপাং করে এক ঘাঁ বেত পড়ে তুহিনের পিঠে! হুজুর চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে-

– আঁমি ছবি আঁকছি কবে বল শয়তানের বাচ্চা?

তুহিন আরো জোর দিয়ে কথা বলে।

– আপনে দিনে রাতে পাঁচবার ছবি আঁকেন। নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহ- রাসুলের ছবি আঁকেন মনের কাগজে, যে মনে ত্রিশপাড়া কোরান রাখছেন -সেই মনে ছবি আঁকলে দোষ নাই! আর আমি আমপাড়ায় আঁকলেই দোষ?

হুজুর আর কোনো কথা খুঁজে পায় না। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছাত্ররা তুহিনের আর হুজুরের কথা শুনছিল। বড় হুজুর একেবারে মৌন হয়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়েছেন। সমস্ত ভাবনার জগত’ই তোলপাড় হয়ে গেছে তার। ঘাম হচ্ছে খুব, মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। পরনের ফতুয়াটা ভিজে উঠেছে।

ইশারায় তুহিনকে এ ঘর থেকে যেতে বলে বড়হুজুর। বড্ড চিন্তার কথা, প্রথম থেকেই তুহিনের আচরণ আর দশজন ছেলের মতো মনে হয়নি। কেমন গম্ভীর হয়ে বসে থাকে, কারো সাথে মেশে না। দরকার ছাড়া কথাও বলে না। আজকের ঘটনায় শাস্তির বদলে তুহিনের প্রশ্ন আর যুক্তির বাণে জর্জরিত হয়ে একপ্রকার পরাজয়ই স্বীকার করে নিতে হয়েছে।

বাকি ছাত্ররা ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে, ওদের মনেও হুজুরের জ্ঞানের পরিধি নিয়ে সন্দেহ জেগেছে এতক্ষণে। আছরের নামাজ আদায় শেষে বেশ কয়েকজন তুহিন কে ঘিরে বসেছে, সকলের চোখেই কৌতূহল। এই সব কথা তুহিন শিখল কি করে? সবার একটাই প্রশ্ন।

বড়হুজুর বারান্দায় পায়চারি করতে করতে বিষয়টা খেয়াল করে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তুহিনকে মাদ্রাসায় রাখা চলবে না। ওর দেখাদেখি সকলের মাথাই বিগড়ে যেতে পারে।

মালেক মিয়াকে খবর পাঠানো হয়েছে, ছোট হুজুর গেছে খবর নিয়ে। বড় হুজুর বাপজানকে ডেকে পাঠিয়েছে জেনে তুহিনের ভয় হচ্ছে। নিশ্চয়ই বাপজান আজকে মেরেই ফেলবে। বাপজান আসার আগেই এখান থেকে পালাতে হবে, যেই ভাবা সেই কাজ।

বাঙালির প্রাণের উৎসব চলছে দিনভর, আজ পহেলা বৈশাখ। বাড়িতে থাকলে আজ কত মজা হতো, মা নানান রকম পিঠা বানাতেন। খুব ভোরে উঠে গোসল সেরে শিমুলতলির মেলায় যাওয়ার প্রস্তুতি, তারপর নয়ন আর সোহাগের সাথে সারাদিন মেলায় ঘোরাঘুরি।নাগরদোলায় চরে ভেপু বাজানো, গরম গরম জিলাপি খাওয়া। কত্ত মানুষ আসে মেলায়, পুতুল নাচ, বায়োস্কোপ আরো কত্ত কি যে দেখা যায়। মেলা চলে সাতদিন, সাতদিনই স্কুল ছুটি থাকে।

খুব মনে পড়ছে নয়ন সোহাগ রেবতীর কথা। গেলবার রেবতীর চুড়ি গুলো ভেঙে দেওয়ার পর মনে মনে ঠিক করেছিল তুহিন, আবার মেলা থেকে জমানো পয়সা দিয়ে চুড়ি কিনে দিবে। আজকে নিশ্চয়ই রেবতী ওর বাপের সাথে মেলায় গেছে।

তুহিন প্রাণপণে ছুটছে আর ভাবছে এইসব। রাস্তায় বাসন্তী রঙের রঙিন জামাকাপড় পরে বেরিয়েছে কত মানুষ,ছেলে মেয়ে বুড়ো সব বয়সিরা। সবাই মেলা থেকে ফিরছে, তুহিনের সমবয়সী ছেলেরা ভেপু বাজাচ্ছে।মেয়েগুলোর হাতভরা লাল টুকটুকে চুড়ি বাজছে কিঙ্কিণ।

কাছেই আলোকদিয়া হাই স্কুল মাঠে বৈশাখী মেলা হয়।ঈশানে মেঘ করেছে, ঝড়ের আশঙ্কায় ব্যস্ত ত্রস্ত পদক্ষেপ সকলের। ভিড় ঠেলে মেলা প্রাঙ্গণে ঢোকে তুহিন, এদিক ওদিক তাকাতেই দেখে মাঠের পূর্বদিকে চুড়ি মালার পশরা সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা।

খুব ইচ্ছে করছে এক গোছা চুড়ি কিনতে, কিন্তু বাড়ি ফেরা আর হবে কিনা সে ভাবনায় স্থির করতে পারছে না কিনবে কি কিনবে না। পকেটে বাপজানের দেওয়া পঞ্চাশ টাকার একটা নোট আছে, যেটা তুহিনের ইচ্ছেমত কিছু কিনে খাওয়ার জন্য দিয়েছিল। গেল কদিনে কিচ্ছুটি খেতে ইচ্ছেই করেনি তুহিনের, তাই টাকাটা তেমনই আছে। তুহিন চুড়ি কিনবে বলে স্থির করে, আজ বাড়ি ফিরতে না পারলেও বড় হয়ে তো একদিন ফিরবেই তুহিন। বাপজান আর মারতে পারবে না তখন,শহরে গিয়ে কাজ করবে আর আঁকা আঁকি করবে। একদিন বড় শিল্প হয়ে সবাইকে দেখিয়ে দেবে তুহিন। দৃঢ় সংকল্প করে বসেছে।

চল্লিশ টাকায় এক ডজন চুড়ি কিনে নিরুদ্দেশ যাত্রায় পা বারায়। মেলার বাহির মুখে আসতেই বিকট শব্দ, কানে তালা লাগা কয়েক মুহূর্ত কেটে যায়! যে যার মত প্রাণপণে ছুটতে থাকে, চিৎকার আর্তনাদ, ছোট শিশুদের কান্না- হৈ হল্লা বেঁধে গেছে। তুহিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই হুরমুরিয়ে লোকজন দৌড়ে আসে, পড়ে যায় ও। মাটিতে মিশে যাচ্ছে যেন, শয়ে শয়ে পা মারিয়ে যাচ্ছে তুহিনের শরীর।

বুকে আগলে রেখেছে চুড়িগুলো, এ গুলো ওর প্রাণের থেকেও যেন মূল্যবাণ।

রক্তাক্ত হয়ে গেছে মুখটা অগণিত পদাঘাতে, শেষ চেষ্টা করছে উঠে দাঁড়ানোর। শরীরের সমস্তটুকু দিয়ে চেষ্টা করে উঠে দাঁড়ায় তুহিন, পায়ে শক্তি নেই। বাঁচার তাগিদে সবাই দৌড়াচ্ছে, কেউ কারো দিকে সাহায্যের হাত বারিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করছে না, তুহিন শুধু ভাবে ভয়াবহ কিছু একটা ঘটেছে! কিয়ামত? দাদির মুখে শুনেছে তুহিন;কেয়ামতের দিন মানুষ শুধু নিজেকে বাঁচাতেই ছুটবে। মা বাবা ভাই বোন কেউ কাউকে চিনবে না। তবে কি কিয়ামত শুরু? তুহিন পা টেনে টেনে দৌড়ায়, দাঁতে দাঁত চেপে দৌড়ায়।

যা হওয়ার হয়েছে, এখন শুধু দৌড়াতে হবে – এটুকুই জানে তুহিন। প্রিজনের সাইরেন বাজছে, তুহিনের মনে হয় ওটা ইসরাফিলের শিঙার আওয়াজ। বেশি দূর আর যেতে পারে না তুহিন, লুটিয়ে পড়ে রাস্তার পাশের নর্দমায়।

গুলি লেগেছে মাথায়, পুলিশের সন্দেহের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি তুহিন। আলোকদিয়ার বিস্ফোরণের খবর ছড়িয়ে গেছে সারাদেশে।টিভি চ্যানেল গুলোতে ব্রেকিং নিউজ করা হয়েছে ‘আলোকদিয়ায় বৈশাখী মেলায় জঙ্গি হামলা, সন্দেহভাজন কিশোর পুলিশের গুলিতে নিহত।’

তুহিনের মৃতদেহ ঘিরে রেখেছে পুলিশ। বোম ডিস্পোজাল স্কোয়াডের সদস্যরা তুহিনের বুকের সাথে জাপটে ধরে রাখা চুড়ির বাক্সটিকে অবিস্ফোরিত বোমা ভেবে নিষ্ক্রয় করণে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।

ঝড় শুরু হয়েছে, প্রচণ্ড বজ্রপাতে ফেটে পড়ছে আকাশ, বিজলি চমকে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। বৃষ্টির দাপট আর ঝড়ের সাপট বাড়ছে ক্রমেই, ইসারফিল বুঝি তার শৃঙায় ফুঁক দিয়ে মহা প্রলয় ঘোষোণা করেছেন।

 

 

  • নীল মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর : কবি ও লেখক

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ