(১ম পর্ব)

নদীর কিনারায় সূর্যের উজ্জ্বল হলদে আভা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছে । রিঠা গাছের রৌদ্রদগ্ধ পাতাগুলাে দম ফেলার সুযোগ পায় । গাছের নীচে চিতা মশার দল ভন ভন করছে । নদীর ধারে কৃষকদের রান্নাঘরের চিমনির ধোঁয়া মিলিয়ে যাচ্ছে । মহিলা ও শিশুরা দরােজার বাইরে জল ছিটিয়ে দিচ্ছে এবং ছােট টেবিল, চৌকি বের করেছে । বােঝা যায় এখন সান্ধ্য খাবারের সময় ।

বুড়াে ও পুরুষরা বসেছে চৌকির ওপর । গল্প করতে করতে তারা বাতাস করছে চেটাল পাতার পাখা দিয়ে । বাচ্চারা ঘােরাঘুরি করছে অথবা রিঠা গাছের নীচে এক্কাদোক্কা খেলছে । মহিলারা টেবিলের ওপর গরম কালো শুকনাে সবজি ও হলদে ভাত সাজিয়ে দিয়েছে । নদীতে প্রমােদতরীতে ছিল কয়েকজন পণ্ডিত । এ সব দেখে শুনে তাদের ভাব উথলে ওঠে । তারা চীৎকার করে উঠে : “আহা, কোন ঝামেলা নেই । এটাই গ্রামীণ জীবনের শান্তি !”

পণ্ডিতরা একটু বাড়িয়েই বলেছিল । তারা শুনতে পায়নি বুড়ী জিউজিন । কি বলছে । রাগে গরগর করতে করতে বুড়ী ছেড়া চেটাল পাখা দিয়ে চৌকির । পায়ায় আঘাত করে বলে ;

“ আমি ৭৯ বছর বেঁচেছি । যথেষ্ট । বসে বসে সবকিছু গােল্লায় যাওয়া দেখতে চাইনা– তারচে মরণ ভালাে। খাওয়ার সময় হয়েছে, তবু তারা ভাজা মটর শুটি খাচ্ছে, বাড়ীঘর সব খেয়ে ফেলবে!”

বুড়ীর প্রপৌত্রী লিউজিন মটরশুটি হাতে তার দিকেই দৌড়ে আসছিল। কিন্তু অবস্থা বেগতিক দেখেই আবার নদীর কিনারায় দৌড়ে গিয়ে রিঠা গাছের পেছনে লুকোয়। তারপর ছােট মাথার বেণীজোড়া দুলিয়ে চীৎকার করে: “আহ, বুড়ীর মরণ নাই।”

বুড়ী জিউজিনের অনেক বয়স হলেও , সে কানে খাটো নয় । বুড়ী শুনতে পায়নি মেয়েটি কি বলেছে । সে নিজের মনেই বিড়বিড়িয়ে বলতে থাকে : “গেছে দিন ভালো দিন । ”

এ গ্রামে একটা অসাধারণ নিয়ম চালু আছে । ছেলে – মেয়ের জন্ম হলে মায়েরা । ওজন করে ওজন দিয়ে নাম রাখে । ৫০ তম জন্মদিন পালন করার পর থেকে বুড়ী জিউজিন খুঁত ধরতে শুরু করেছে । সবসময় বলবে তার যৌবনে গরমের দিনে এত গরম ছিল না, মটরশুটি গুলাে এত শক্ত ছিল না । সংক্ষেপে বলা যায় এই কলিকালে কিছু একটা দারণ গােলমাল লেগেছে । না হলে, লিউজিনের ওজন কেন তার প্রপিতামহের চেয়ে তিন জিন এবং বাবার চেয়ে এক জিন কম হবে? এ প্রমাণ উল্টানাে যাবে না । তাই সে জোর দিয়ে বারবার বলে : “গেছে দিন ভালো দিন ।”

তার পৌত্র – বধু ছিজিন সবে টেবিলে ভাতের ঝুড়ি নিয়ে এসেছে। টেবিলের ওপর তা ঢাকতে ঢাকতে সে রাগে বলতে থাকে : “তুমি আবার এসেছ? লিউ জিনের জন্মের সময় তার ওজন হয়েছিল সাড়ে ছয় জিন, নয়কি? তোমার। বাড়ীতে দাড়ি – পাল্লার পাথরের ওজন বেশী, আঠারাে লিয়াং – এ এক জিন। মাল লিয়াং – এ এক জিনের পাথর হলে লিউজিনের ওজন সাত জিনের বেশী । হােত । আমার মনে হয় না দাদা এবং বাবার ওজন সত্যি নয় জিন বা আট দিন হয়েছিল । সম্ভবতঃ সে আমলে এক জিন ছিল চৌদ্দ লিয়াং……”

“গেছে দিন ভালাে দিন।”

ছিজিনের বউ জবাব দেবার আগেই গলির মাথায় স্বামীকে দেখতে পায় । রাগ গিয়ে পরে স্বামীর ওপর : “ঢিলা কোথাকার, এত দেরী হল কেন? সারা । সারাদিন কোথায় ছিলে? খাওয়া নিয়ে কতক্ষণ বসে থাকি তাতে তােমার কিছু যায় আসে না ।”

গ্রামে থাকলেও ছিজিন সবসময় নিজের ভালো করতে চেয়েছে । দাদার আমল থেকে তিনপুরুষে তার পরিবারের কেউ নিড়ানি ধরেনি । বাপের মতই সে নৌকো চালায়। সকালে যেন থেকে শহরে যায়, সন্ধ্যায় ফিরে আসে। তাই সে দিন দুনিয়ার খবর ভালােই জানে। যেমন, বাজ – দেবতা কোথায় কেন্নে আত্মাকে মেরেছে, কোথায় কুমারী মাতা দৈত্য প্রসব করেছে। এ নিয়ে গাঁয়ে নাম থাকলেও, তার পরিবার গাঁয়ের নিয়ম কানুন মেনে চলে এবং গরমে সান্ধ্য ভােজের জন্য বাতি জ্বালায় না । তাই দেরী করে ফিরলে তাকে গালি শুনতে হবে । ছিজিনের এক হাতে ফুটকি দেয়া বাঁশের লগি। ছয়ফুটের চেয়ে লম্বা। লগির মাথায় হাতির দাঁতের ও দস্তার কাজ করা। মাথা নীচু করে ধীরে ধীরে হেঁটে

গিয়ে সে একটি চৌকির ওপর বসে। সুযোগ খুঝে লিউজিন বেরিয়ে এসে তার পাশে বসে পড়ে। সে কথা বলতে থাকে, কিন্তু জান পায় না।

বুড়ী জিউজিন বিড়বিড় করতে থাকে : “গেছে দিন ভালো দিন।”

ছিজিন ধীরে মাথা তুলে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে : “সম্রাট আবার সিংহাসনে বসেছেন।” ছিজিনের বউ হঠাৎ বোকা বনে যায়। তার পর বুঝতে পেয়ে আনন্দে চীং কার করে ওঠে : “ভালাে কথা। সম্রাট আবার ক্ষমা ঘােষণা করবেন, নয় কি?”

ছিজিন আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে : “আমার কোন বেণী নেই।”

“সম্রাট কি বেণী রাখতে চান?”

ছিজিনের বউ বিচলিত হয়ে পড়ে । সে জানতে চায়, “তুমি কেমন করে জান?”

“ শুভ – শুড়ীখানায় সবাই তাই বলে।”

ছিজিনের বউ বুঝে নেয় অবস্থা বেগতিক । শুভ – শুড়ীখানাই সব খবরের আড্ডা । ঘৃণা এবং ক্ষোভের সঙ্গে সে স্বামীর নেড়া মাথার দিকে তাকায়। তার পর হাল ছেড়ে দিয়ে থালায় ভাত ভর্তি করে তার সামনে শব্দ করে রাখে, “তাড়াতাড়ি খাও! কাঁদলে তােমার বেণী গজাবে না।”

সূর্যের শেষ আলােটুকু মিলিয়ে গেছে । কালো জল ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে । নদীর পাড়ে হাঁড়ি – পাতিলের টুংটাং শব্দ শােনা যাচ্ছে, সেখানে লােক জনের পিঠে ঘাম বেরিয়ে গেছে। ছিজিনের বউ তিন বাটি ভাত শেষ করেছে এমন সময় কিছু একটা দেখতে পেয়ে তার হৃৎকম্প বেড়ে যায়। রিঠা গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সাঁকোর ওপর মিঃ যাও- র ছােটখাটো মােটা শরীর দেখা যাচ্ছে। তার পরণে নীল রংয়ের সুতী গাউন।

মিঃ যাও পাশের গ্রামের সমৃদ্ধ শুড়ীখানার মালিক। আশেপাশের দশ মাইলের মধ্যে তিনিই একমাত্র নামকরা ব্যক্তি এবং একটু লেখাপড়া জানেন। এই লেখা পড়া তার বিগত যুগের এক ধরনের মেজাজের কারণ হয়েছে। তাঁর কাছে জিন শেংথান এর টীকা লেখা ‘তিন রাজ্যের কাহিনী’- এর বারাে খণ্ড বই আছে । এগুলাে তিনি অক্ষর ধরে ধরে বার বার পড়েন । তিনি পঞ্চ ব্যাঘ্র সেনাপতি দের নাম জানেন এবং ছয়াংযােং হানশেং হিসেবে এবং মা ছাও মেংছি হিসেবে পরিচিত একথাও বলতে পারেন। বিপ্লবের পর তাও ধর্মযাজকদের মত তিনি চুলের বেণীকে মাথার ওপর কুণ্ডলী পাকিয়েছেন এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন যাও ইয়ন বেঁচে থাকলে সাম্রাজ্যের এই দশা হতো না।

ছিজিনের বউয়ের চোখের নজর ভালো । তাই সে দেখতে পায় আজকে মিঃ যাও তাও  ধর্মযাজকদের মত চুল বাঁধেন নি। তাঁর মাথার সামনের দিকটা নেড়া এবং বেণী দুলছে । সে বুঝতে পারে সম্রাট সিংহাসনে বসেছেন, বেণী জরুরী হয়ে পড়েছে এবং ছিজিনের মহাবিপদ। বিনাকারণে মিঃ যাও তার একবার যখন তার শত্রু বসন্তের দাগওয়ালা আহ্ সি রোগে পড়েছে, আর একবার যখন তাঁর শুড়ীখানা গুড়িয়ে দেয়া মিঃ লু মারা গেছে। আজকে তৃতীয় বারের মত পরেছেন। নিশ্চয়ই তার জন্য আনন্দের এবং শক্রদের জন্য ক্ষতিকর কিছু একটা ঘটেছে।

ছিজিনের বউয়ের মনে পড়ে দু বছর আগে মাতাল হয়ে তার স্বামী মিঃ যাওকে “হারামজাদা” বলে গাল দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝতে পারে তার স্বামীর মহাবিপদ এবং তার বুক কাঁপতে থাকে।

মিঃ যাও পাশ কাটানাের সময় লােকজন উঠে দাড়ায় এবং ভাতের বাটির দিকে কাঠি – তাক করে বলে: “আসুন, খেতে বসুন মিঃ যাও।”

মিঃ যাও মাথা নেড়ে সবাইকে বলেন : “আপনারা খান। তিনি সােজা চলে যান ছিজিনের টেবিলে। তাকে স্বাগত জানানাের জন্য সবাই উঠে দাঁড়ায়। মুচকি হেসে মিঃ যাও বলেন : “খেতে থাকো।” টেবিলের ওপর খাওয়ার দিকেও  তিনি একবার চোখ বুলিয়ে নেন।

“শুকনাে সবজিগুলাের বেশ সুবাস – খবর শুনেছ?” ছিজিনের বউয়ের উল্টো দিকে ছিজিনের পেছনে মিঃ যাও দাঁড়িয়ে ছিলেন।

ছিজিন বলে : “সম্রাট সিংহাসনে বসেছেন।”

মিঃ যাও অভিব্যক্তি দেখে ছিজিনের বউ জোর করে হাসে । সে জিজ্ঞেস করে : “সম্রাট সিংহাসনে বসেছেন। কখন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করবেন?”

“সাধারণ ক্ষমা? –ঠিক সময়েই সাধারণ ক্ষমা ঘােষিত হবে।” মিঃ যাও – এর গলা কঠোর হয়ে আসে । “ছিজিনের বেণীর কি হবে? সেটাই গুরুত্বপূর্ণ । তুমি জান লম্বাচুলের আমলের কথা : চুল রাখ মাথা যাবে, মাথা রাখ চুল যাবে…..”

ছিজিন এবং তার বউ কখনাে লেখাপড়া করেনি, তাই তারা এসবের কিছু জানে না। তাদের মনে হয় যেহেতু মিঃ যাও বলেছেন, তাই ব্যাপারটা গুরুতর, উল্টানাে যাবে না । তাদের মনে হল যেন তাদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে । তাদের কান ঝিঁ ঝিঁ করতে থাকে । তারা আর একটি কথাও বলতে পারে না ।

চলবে…

 

  • অনুবাদ :মাহফুজ উল্লাহ