গণটিকা দেওয়া ছাড়া উপায় নেই

একদিনে ২৪৭ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৫ হাজার ১৯২। মহামারি শুরুর পর এটি নতুন রেকর্ড। তবে আমি বলবো খারাপ সময় তো আরও বাকি। সারাদেশের গ্রামে-গঞ্জে যেভাবে করোনা ছড়িয়েছে তাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এই মুহুর্তে তাহলে করণীয় কী? আমি বলবো গণটিকা দিতে হবে। আর সেখানে আমরা এখনো বহুপিছিয়ে।

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্টনি ফাউসির সাক্ষাতকার পড়লাম। তিনি পরিস্কার করে বলেছেন, যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম, সেখানে করোনাভাইরাসের ডেলটা ধরনের সংক্রমণ বাড়ছে।

আসলেও তাই। আমরা টিকাদানে ভয়াবহভাবে পিছিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় মৃত্যুহার দেখেন। সবার আগে আফগানিস্তান, এরপর পাকিস্তান, তারপরেও বাংলাদেশ। যে ভারত নিয়ে আমরা এতো এতো কথা বলছি তারা কিন্তু তাদের দেশের ৪৩ কোটি লোককে টিকা দিয়ে ফেলেছে। আর আমরা? ১৭ কোটি লোকের দেশে টিকার দুই ডোজ পেয়েছে এমন লোকের সংখ্যা মাত্র ৪৩ লাখ।

অবশ্য শুধু টিকাদানে নয়, সবসময়ই আমরা করোনা ভাইরাসের চেয়ে পিছিয়ে। আমরা বারবারই একই ভুল করেছি। যথাসময়ে যথা প্রস্তুতি নেইনি। সারা দুনিয়াতে যখন কোভিড আমরা ভাবি আমাদের কিছু হবে না। যখন দিনে ৫০ হাজার পরীক্ষা করার কথা আমরা করেছি পাঁচ হাজার। যখন হাসপাতাল সব প্রস্তুত করার কথা আমরা করতে পারিনি।

এমনকি পাশের দেশ ভারতেও যখন মৃত্যু তখনো আমরা ভেবেছি আমরা তো ভালো আছি। এসব নিয়ে বলতে বলতে ক্লান্ত। তাও বলি এই কারণে যদি আমাদের বোধ ফেরে। যদি আমরা সবাই একটু সচেতন হই। কিন্তু কে শোনে কার কথা? শুধু নীতি নির্ধারকদের দোষ দেব কেন? এই যে দেখেন আমাদের দেশের সরকাবিরোধী বহু লোক, রাজনীতিবিদ, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা বহু লোক শুরুতে টিকার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে। এদের কোন বিবেকও নেই।

যাই হোক আশার কথা হলো সাধারণ মানুষের কিন্তু টিকা নেওয়ার আগ্রহ বাড়ছে। একদিকে যেমন টিকার জন্য নিবন্ধন বাড়ছে, তেমনি কেন্দ্রে ভিড় বাড়ছে। কিন্তু আমরা এখনো প্রচণ্ড গতিতে টিকা দিতে পারছি না।

একটু হিসেব করে দেখেন, দেশে ৭ ফেব্রুয়ারি গণটিকাদান শুরু হয়েছিল। পৃথিবীর বহু দেশের আগে আমরা টিকা পেয়েছিলাম। কিন্তু ভারত তাদের সংকট দেখিয়ে যথাসময়ে টিকা না দেয়ায় এবং আগে থেকে আমাদের অন্য কোন সোর্স না থাকায় আমরা পিছিয়ে পড়ি। আশার কথা গত এক মাসে আমরা সেই সংকট কাটিয়ে উঠেছি। নানা জায়গা থেকে টিকা আসছে এখন।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে টিকা এসেছে ২ কোটি ১৫ লাখ ৪৫ হাজার ডোজ। নিবন্ধন করেছেন ১ কোটি ২১ লাখ ৭০ হাজার ৪৪৫ জন। কিন্তু টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছেন ৭৫ লাখ ৬০ হাজার। আর দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে মাত্র ৪৩ লাখ। আমি বলবো খুবই কম সংখ্যাটা। আমাদের দ্রুত এই সংখ্যাটা বাড়াতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে দেখলাম তিনি বলছেন, আগামী বছরের মধ্যে দেশের ১৭ কোটি জনসংখ্যার ৮০ শতাংশকে টিকা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন। আমি বলবো আগামী বছর না পারলে আগামী পাঁচ মাসেই পাঁচ কোটি লোককে টিকা দিয়ে দেন। ১৮ বছররের উপরের সবাইকে গণটিকা দেয়া শুরু হোক।

আমি মনে করি না মাসে এক কোটি লোককে টিকা দেয়া কঠিন কিছু। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন চার লাখ মানুষকে টিকা দিতে হবে। এটি সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু এক দিনে ৩০ লাখ মানুষকে টিকা দিয়েছে দিতে পেরেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত এক দিনে ৮০ লাখ মানুষকে টিকা দিয়েছে। সেই তুলনায় আমাদের তো আরও এগিয়ে থাকার কথা।

আজ শিশিরদার একটা লেখায় দেখলাম, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় সারা দেশের শহরে ও গ্রামে ১ লাখ ২০ হাজার স্থায়ী টিকাকেন্দ্র আছে। হাম-রুবেলা বা অন্য কোনো টিকার বিশেষ প্রচারণার সময় এসব কেন্দ্র থেকে দিনে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। তার মানে চাইলে আমরা পারবো।

নীতি নির্ধারকদের কাছে শুধু অনুরোধ, ভাবুন। উপায় বের করুন। আমরা চাইলে উপায় হবেই। মনে রাখবেন, যথা পিছিয়ে আমরা থাকবো ততো মৃত্যু বাড়বে। যতো এড়িয়ে যাবো, যতো ভাববো আমরা ভালো আছি ততো বিপদ বাড়বে। এই যে দেখেন, গত বছরের শুরুতে লিখেছিলাম দিনে ৫০ হাজার করোনার টেস্ট করা উচিত। সেটা এক বছর পরে এসে হচ্ছে। আসলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনায় আমরা পিছিয়ে। অথচ করোনার সঙ্গে জিততে হলে ভাইরাসের আগে ছুটতে হবে।

কাজেই আর পিছিয়ে থাকা নয়। সাধারণ নাগরিকদেরও বলি, চলুন আমরা সতর্ক হই। মাস্ক না পারলে, টিকা না নিলে কিন্তু বিপদ। যতো দেরিতে আমরা বুঝতো ততো ক্ষতি। এই যে আমাদের ভয় কেটে গেছে, আড়াইশ মানুষের মৃত্যুও এখন আর আমাদের আতঙ্কিত করে না সেটা কিন্তু ভয়ঙ্কর বিষয়। এই ভয় কেটে যাওয়াটাই ভয়ের।

নীতি নির্ধারকসহ সবার কাছে করজোড়ে অনুরোধ, চলুন আমরা যে যেখানে আছি, যে যে পদে আছি, যে যে কাজে আছি সবাই দায়িত্বশীল হই। আবারও বলি, আমরা যদি হেরে যাই, কোথাও ব্যর্থতা দেখাই, শুধু যে হাজার হাজার মানুষ মরে যাবে তাই নয়, অনেককিছুই ভেঙে পড়বে। কাজেই আসুন দায়িত্বশীল হই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভালো রাখুন। ভালো থাকুক প্রিয় বাংলাদেশ।

 

  • শরিফুল হাসান : সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ