কবিতা ভাবনা ও কবিতা : কায়েস সৈয়দ

 

চোখ

কতকটা প্রয়োজনে কতকটা অপ্রয়োজনে হেঁটেছি দীর্ঘ পথ দিন মাদান নেই হাঁটা শুধুই ক্লান্তিহীন রাস্তার অলিগলি বস্তির সরুগলি দেখেছি জীবন মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাত সঙকট সমাজকে নেড়ে নিয়েছি একান্ত পাঠ অবাক হলেও সত্য এখন আমি চাইলেই মানুষের শরীর পড়তে পারি রেলস্টেশনে বৃদ্ধভিখারির কপালের ভাঁজ গুণে বলে দিতে পারি দুশ্চিন্তার কারণ শাহবাগে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুর মুখের অভিব্যক্তি প্রজেক্টরের মতো আমার চোখে ভাসিয়ে তোলে তার মায়ের পরিণতি নারীর কোমর আর নিতম্বের ঢেউয়ে অনুভব করতে পারি একুশ বছর দমিয়ে রাখা ভেতরের কামআগুনের নীলাভ তীব্রতা যুবকের আঙুল আর আঙুলের নখে শুনতে পাই আটাশ বছর কিঙবা জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় হাতের মুঠোয় শিশ্ন রাখার প্রচণ্ড আর্তনাদ ওভারব্রিজে ল্যান্ডিঙে ওয়াকিঙ স্টিক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা অন্ধের চোখে পাই তার ভিক্ষার টাকা দিয়ে সন্তানের আয়েশ করে খেয়ে যাওয়া মদের তীব্র গন্ধ মানুষের চোখ পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক অঙ্গ আমি চোখ দিয়ে ঝরতে দেখি সমস্ত অযাচিত সত্য মিথ্যা ভয় লোভ লালসা এমনকি লজ্জাবতীর মতো লুকিয়ে ফেলা আকাক্সক্ষাকামতৃষ্ণা

রিক্সাওয়ালারচোখ মুদিদোকানিরচোখ কৃষকেরচোখ মুচিরচোখ মাছবিক্রেতারচোখ আমবিক্রেতারচোখ টোকাইরচোখ মৌলভীরচোখ চোরেরচোখ চাকরেরচোখ শ্রমিকেরচোখ মালিকেরচোখ চিকিৎসকেরচোখ প্রকৌশলীরচোখ সেবিকারচোখ প্রেমিকারচোখ বিধবারচোখ বালিকারচোখ শিশুরচোখ নেতারচোখ মেয়রেরচোখ এমপিরচোখ রাষ্ট্রপতিরচোখ বামপন্থীরচোখ কবিরচোখ কমিশনারেরচোখ প্রধানমন্ত্রীরচোখ ঘষেটিরচোখ মৃতেরচোখ জীবিতেরচোখ একেক জোড়া চোখে একেক স¦তন্ত্রতা একেক জোড়া চোখে ভয়ানক সব বিস¥য় এক জীবনে এই চোখই পাঠ্য চোখে আঁকা থাকে মানুষের এপিঠওপিঠ…

আমি ফসলের বাম্পার ফলনের যে মাঠে কৃষকের চোখে দেখেছি ন্যায্যমূল্য পাবার সঙশয় সে মাঠেই দেখেছি সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীর মুনাফার অট্টহাসি আমি দেখেছি ত্রাণের যে চালে আড়ালে মধ্যবিত্তের নির্ভরতা সে চালেই মহান নেতার প্রকাশ্য রোজনামচা আমি প্রধানমন্ত্রীর চোখের এপিঠে দেখেছি মন্ত্রীত্ব না চেয়ে দেশের সেবায় অকাতরে জীবন দেয়ার প্রত্যয় আর ওপিঠে দেখেছি গদির চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে প্রশ্নফাঁস করে পরিকল্পিতভাবে মেরুদণ্ডহীন প্রজন্ম তৈরির চেষ্টা চোখের মুদ্রার এপিঠে চড়ে জেনে গেছি ওপিঠ জেনেছি মানুষ হতে হলে বড় হৃদয়ের দরকার নির্মোহ হওয়া দরকার সঙ্কীর্ণ হৃদয় নিয়ে মানুষের চোখের নৌকো এখন আর চূড়ান্ত গন্তব্য না…

 

 

ফাউলিঙমার্ক

আমাদের অবাক দুটো হৃদয় পাশাপাশি সমান্তরাল ডাবললাইন রেলের উপর প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চলা দুটো ট্রেন আমাদের হৃদয়ের উন্মত্ততায় পৃথিবী থমকে দাঁড়ায় আমরা তবু ক্ষিপ্র গতিতে ধাবমান আমাদের বেগবৃদ্ধিরহার হার মানায় সমস্ত গতির ক্যালকুলাস সামনে এগোতে থাকি আমরা কিঙবা উল্টোদিকে দৌড়তে থাকে গাছ একটু পরেই জীবনের জঙশন ডাবললাইন রেলওয়ে দুটিকে মিলিত হতে হবে একই লাইনে টানাপোড়ন সম্পর্কের অবাক হৃদয়দুটি ফাউলিঙমার্কের কাছে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় প্রশ্নবোধকের দ্বারপ্রান্তে উত্তরের অবস্থান কেমন তুমি আমি নাকি আমরা

 

তুমি

তুমি যেনো পাহাড় দূর থেকে সুন্দর
উপরে উঠলেই উধাও

 

চুল ও পাথর

কেউ কেউ চুলকে নদী বানায় নদীকে বানায় সমুদ্র কেউ কেউ চুলকে চাবুক বানায় চাবুককে বানায় অস্ত্র আমি কিছুই বানাই না ভাবি অবাক হই দেখে চুলের বেড়ে ওঠা যেমনটা বেড়ে ওঠে পাথর

 

অপূর্ণতা

এবার শীতে একগুচ্ছ কলমিফুল কিনবো তোমার চুলের অরণ্যে শোভা পাবে সেই ফুল আনাজিকলার সবুজ কুঁচিতে লালশাক লালে রাঙাবো শাড়ির আঁচল বরইফুল তোমার নাকফুল কানের দুল মাদারফুল গলায় শোভা পাবে হিজল আমি শুঁকতে থাকবো চোখ বুজে ঘ্রাণ নিয়ে ছুঁয়ে ফেলবো ঠিকই তোমার শরীর হাড় অস্থিমজ্জা আর লিখবো কবিতা যা কখনো পূর্ণতা পাবে না

 

  • কায়েস সৈয়দ : কবি ও অনুবাদক

 

 

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ