করোনা মহামারি এমন ধূমকেতু নয় যার লেজে সমাজতন্ত্র বাঁধা আছে : সালমান রুশদি

ক্রিস্টোফার বোলেন

করোনা মহামারির বাস্তবতায় সম্প্রতি ইন্টারভিউ ম্যাগাজিন ডটকমকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ম্যান বুকারজয়ী খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক সালমান রুশদি। এখানে মহামারি নিয়ে খোলামেলা কথা বলার পাশাপাশি জানিয়েছিলেন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনিও। নিউইয়র্ক শহরে বসবাসরত এই লেখক এ সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন করোনার ভালো-মন্দ, নিজের পড়াশোনা ও পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে। ক্রিস্টোফার বোলেনের নেওয়া সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন ফাতেমা রিয়া

প্রশ্ন: এখন কোথায় আছেন? কত দিন ধরে বিচ্ছিন্ন?

রুশদি: ম্যানহাটানে আছি, বাসাতেই। মার্চের মধ্যভাগে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। তবে সৌভাগ্যবশত বিপজ্জনক অবস্থায় যায়নি। মার্চের শেষে সুস্থ হয়ে উঠি, তারপর থেকে কোয়ারেন্টিনে আছি।

প্রশ্ন: এই মহামারির সময়ে সমাজ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?
রুশদি: এটা মানুষের ভালো দিক ও খারাপ দিক সম্পর্কে আমার বোঝাপড়া চাঙা করে তুলেছে বলা যায়। ভালো দিকটা হলো সম্মুখযোদ্ধাদের নিঃস্বার্থ লড়াই এবং প্রতিকার খুঁজে পেতে মেধাবী বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টা। আর সবচেয়ে খারাপ দিকটা হলো সমাজের একটা অংশের মানুষের অধঃপতন। মানুষজন আক্রমণাত্মক, প্রতিকূল, অজ্ঞ ও গোঁড়া হয়ে উঠেছে। এই মহামারি মহত্ত্ব ও কদর্যতা উভয় দিকেই আলোকপাত করেছে। বিদ্বেষকে জয় করার বাসনাও প্রবল হয়ে উঠেছে। ‘লর্ড অব দ্য ফ্লাইস’ উপন্যাসে দেখানো সভ্যতার সঙ্গে বর্বরতার দ্বন্দ্বের মতো অনেকটা।

প্রশ্ন: সমাজ নিয়ে আপনার যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তার কতটা পরিবর্তন করেছে এই মহামারি?

রুশদি: মহামারি আমার কাছে সমাজটাকে আগের থেকে স্বচ্ছভাবে দেখিয়েছে। সভ্যতা কতটা ভঙ্গুর, যা শক্ত ভাবি তা কত সহজেই বাতাসে মিলিয়ে যেতে পারে, তা স্পষ্ট হয়েছে।

প্রশ্ন: ভবিষ্যতে এর চেয়ে খারাপ কী হতে পারে?

রুশদি: সম্প্রতি একজন চিকিৎসক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কী হবে যদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ভ্যাকসিন কোনোটাই না আসে? সে উচ্ছ্বসিতভাবে উত্তর দিল, তাহলে সবাই মারা যাচ্ছি।

প্রশ্ন: এই লকডাউন থেকে ভালো কিছু আসার সম্ভাবনা আছে? কোনো আশার আলো আছে কি?

রুশদি: আমি জানি না এই প্রশ্নটা কেন ওঠে বারবার। আমাদের পূর্বপুরুষেরাও নিজেদের জিজ্ঞাসা করেছিল, ব্ল্যাকডেথ থেকে ভালো কী আসবে? এটা কেন বিশ্বাস করা হয় সব বৈশ্বিক দুর্যোগের ইতিবাচক দিক থাকবে। সবচেয়ে ভালো যা আসতে পারে তা হলো, আমরা জানব আমাদের শক্তি আছে, মোকাবিলা করার সামর্থ্য আছে। সেটা ব্যক্তিগত ও সম্প্রদায়গত দুইভাবেই।

তারপর আবার এটাও আশা করা হয় সমাজ আরও দয়ালু, শান্ত, কম লোভী, বাস্তুসচেতন ও অংশগ্রহণমূলক হবে। আমার কাছে মনে হয়, এটা আদর্শিক আকাঙ্ক্ষা। করোনা মহামারি এমন ধূমকেতু নয় যার লেজে সমাজতন্ত্র বাঁধা আছে। পৃথিবীর শক্তিকাঠামোগুলোর নির্মাতা এবং সুবিধাভোগীরা এত সহজে তাদের লাভজনক প্রকল্প বদলাবে না, বর্জনও করবে না। তবে হ্যাঁ, আমরা সুন্দর পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম করতে পারি। কে জানে হয়তো আমাদের শিশুরা এর দেখা পাবে। আশা করার মতো কারণ সব সময় আছে। মানবজাতি বিপদের মুখে সর্বদা স্থিতিস্থাপকতা ও উদ্ভাবনীক্ষমতা দেখিয়েছে। আশা করি, এই গুণগুলো আমাদের মধ্যে আবার দেখা দেবে।

প্রশ্ন: করোনা মোকাবিলায় সরকারগুলোর ভূমিকা কীভাবে মনে রাখা হবে বলে আপনার ধারণা?

রুশদি: কিছু ইউরোপিয়ান রাষ্ট্র (যেমন, জার্মানি) তাদের সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। যে দেশগুলো নিয়ে আমি বেশি ভাবি, আমেরিকা, ব্রিটেন, ভারত—এসব দেশে সরকারগুলোর ব্যবস্থাপনাকে চরম অযোগ্যতার নিদর্শন হিসেবে মনে রাখা হবে। ভদ্রভাবে এত দূরই বলা সম্ভব।

প্রশ্ন: এই সময়ে আপনার দৈনন্দিন জীবনযাপন কেমন?

রুশদি: লেখার রুটিন আগের মতোই আছে অনেকটা। ঘুম থেকে ওঠা, কফি খাওয়া, ডেস্কে গিয়ে বসা, কাজের ভান করা। মাঝেমধ্যে বাইরে হাঁটতে যাই (মাস্ক আর গ্লাভস পরে)।

শুধু অন্য মানুষগুলো নেই, আনন্দও নেই।

প্রশ্ন: আপনার চুলের অবস্থা নিয়ে বলুন তো।

রুশদি: দারুণ। আমি ভাগ্যবান, এমন একজন শিল্পীর সঙ্গে লকডাউন কাটাচ্ছি যে শুধু ভাষা আর চিত্র নিয়েই কাজ করে না, চুল কাটা নিয়েও করে। (সালমান রুশদি বর্তমান বান্ধবী রাচেল এলিজা গ্রিফিথসের সঙ্গে থাকেন। এলিজা একজন কবি ও শিল্পী)।

প্রশ্ন: পৃথিবীর এই অবস্থায় ভয়ের পাল্লায় নিজেকে দশে কত দেবেন?

রুশদি: ভয় পাচ্ছি না। তবে দুঃখভারাক্রান্ত আছি। দুঃখের পাল্লায় সেটা ওপরেই বলা চলে, ৮ দেব।

প্রশ্ন: এই বিচ্ছিন্ন জীবনে শেষ পড়া উপন্যাস, চলচ্চিত্র ও গানের অ্যালবাম সম্পর্কে জানতে চাই।

রুশদি: উপন্যাস—‘নিঃসঙ্গতার এক শ বছর’ ( দুঃখিত, কৌতুকের মতো শোনাচ্ছে কথাটা), চলচ্চিত্র—আমি অবশ্য পছন্দ করতে পারি না। তবে পুরোনো দিনের নান্দনিক চলচ্চিত্র দিয়ে নিজেকে ঝালিয়ে নিচ্ছি। ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভের প্রেমে পড়েছি আবার। আর গানের অ্যালবাম স্টিভ ওয়ান্ডারের ‘ইন দ্য কি অব লাইফ’।

প্রশ্ন: কার সঙ্গে এক মাস লকডাউনে থাকা পীড়াদায়ক হবে?

রুশদি: প্রিন্স এন্ড্রু।

প্রশ্ন: কোন চিন্তকের লেখা সর্বশেষ স্বস্তি দিয়েছে?

রুশদি: জেমস বাল্ডউইন। ঠিক স্বস্তি না অবশ্য। তবে আমেরিকায় বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ক্রোধের প্রকাশটা তিনি ভালোভাবেই করেছেন।

সূত্র/প্রথম আলো অনলাইন/অনুবাদক ফাতেমা রিয়া

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ