এরপরেও মনে হয় কোভিড ভাইরাস বেশি নৃশংস!

কোভিড এক অপরিচিত ভাইরাস। ধরাধামে এই প্রায়জীবের আবির্ভাবের পর থেকে তটস্থ আমরা সবাই অপেক্ষায় আছি কতয় গিয়ে শেষ হবে এই মৃত্যুদূতের শিকারের সংখ্যা। আশায় আছি গণনা গুলিয়ে ফেলবার আগে ভ্যাকসিনেশনের দৌলতে আমরা রুখে দিতে পারবো এই trail of devastation.
কিন্তু, আর‌ও নৃশংস, আর‌ও অমোঘ এক ভাইরাসের হাত থেকে আমাদের বাঁচাবে কে!
কোন সে ভাইরাস?
অনেকেই বুঝে গেছেন যে আমি মানুষ ও তার লোভের কথা বলছি। সাবেক দক্ষিণ-পশ্চিম অ্যাফ্রিকা তথা আজকের নামিবিয়ায় হেরেরো ও নামা জাতির মানুষদের ওপর নামিয়ে আনা প্রথম holocaust-এর কথা জার্মানি স্বীকার করেছে এক শতাব্দী পার করে।
তার আগে পর্যন্ত্য বিশ্ববাসী holocaust বলতে শুধুই ইহুদীনিধন বুঝতো।
যদিও সেই সাথে আর‌ও অসংখ্য রোমানি, LGBTQ, কমিউনিস্ট এবং সবচেয়ে লজ্জার কথা অন্যভাবে সক্ষম মানুষদের‌ও হয়েছিল ওই একই পরিণতি।
তবু তারা হয়ত ইওরোপের অধিবাসী সাদা চামড়ার মানুষ বলেই আগাগোড়াই আলোচনায় থেকেছেন।
কিন্তু, তথাকথিত সভ্যতার লাইমলাইটের বাইরে পৃথিবীর আর এক প্রান্তে ঔপনিবেশিক শক্তির নৃশংসতা কোন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছতে পারে মানবিক অপকীর্তির সেই লজ্জাকর উদাহরণ ঘটনা ঘটে যাওয়ার অর্ধশতাব্দী পরেও জনসমক্ষের আড়ালেই রয়ে গেছিল। ২০০৫ সালে প্রথম সেই মানবিক (অমানবিক বলবো কোন যুক্তিতে?) দুষ্কর্ম সরকারীভাবে স্বীকার করেছিল জার্মানি সরকার।
এক‌ই পর্যায়ের মানবাধিকার হননের নজির আছে বেলজিয়ান কঙ্গোতেও।
ভাবা যায় একটা গোটা দেশ ও তার অধিবাসীরা বেলজিয়ামের রাজার প্রাইভেট এস্টেট ও সেখানকার প্রজা, অত‌এব সবধরণের আন্তর্জাতিক আইনের আওতার বাইরে, এই অজুহাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শোষণের শিকার হয়েছে! এক‌ই ঘটনা ঘটিয়েছে স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মহান আদর্শের উদ্গাতা ফ্রান্স‌ও।
মাদাগাস্কারের অধিবাসীদের ওপরে যে এথনিক ক্লেনজিং তারা চালিয়েছে সেই রক্তাক্ত ও ঘৃণ্য অতীতকে ফ্রান্স আজ‌ও সরকারীভাবে স্বীকার করেনি।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের “প্রোলেতারিয়েত স্বর্গ” এবং আজকের জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের চিনে উইঘুর তিব্বতীদের ওপরে ঠিক কতটা কী চলেছে এবং চলছে সেটাও মানুষের সার্বিক কীর্তির আলেখ্যের‌ই অন্তর্গত।
এসব হঠাৎ করেই মনে চাগাড় দিয়ে ওঠার কারণ আর‌ও গ্লানিকর একটি অতীত কীর্তির খবর প্রকাশ্যে আসা।
বিস্তারিতয় না গিয়ে এটুকুই বলি, কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার একটি আবাসিক স্কুলের ভেতরের কম্পাউন্ডের মাটির নিচে প্রায় দুশো আমেরিকান আদিবাসী শিশুর কঙ্কাল উদ্ধারের খবরটা গুগলে খোঁজ করে দেখবেন।
কোভিডের সন্ত্রাসরোধে ভ্যাকসিনের আশাবাদ এক অলীক কল্পনার মত‌ই শোনাবে যখন জানাই হবে এখন পর্যন্ত্য উৎপাদিত শুধু নয়, আগামীদিনে যতটা উৎপন্ন হবে সেই ভ্যাকসিনের কত শতাংশ ধনী দেশগুলোর জিম্মায় চলে গেছে। আর অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর বৃহত্তর জনসংখ্যার ভাগে পড়েছে কতটুকু ভ্যাকসিন?
অন্যদের কথা আর কীই বা বলবো! আমার এই দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার অনায়াসে দেশজোড়া লকডাউন ঘোষণা করে দেওয়ার সময় একবারও ভেবে দেখে না পঁয়তাল্লিশ লাখ শ্রমিকের কী হবে।
আবার ওই একই সরকার ঘোষণা করে দেয় ৩১ ডিসেম্বর, ২০২১-এর মধ্যে “সবার জন্য ভ্যাকসিন কর্মসূচি” সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। অথচ তার জন্য প্রয়োজন দৈনিক অন্ততঃ নব্ব‌ই লক্ষ ভ্যাকসিনের ডোজ।
সেটা আসবে কোথা থেকে তা এইমুহুর্তে কেউ জানে না।
এরপরেও মনে হয় কোভিড ভাইরাস বেশি নৃশংস!

 

 

  • ভাস্কর চক্রবর্তী, প্রাবন্ধিক

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ