একাত্তর নিয়ে কথকতা : হায়াৎ মামুদ


এই নিয়ে কতবার যে হল! সেই সুদূর ছিয়াশিতে (ফাল্গুন ১৩৯২/ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬) এ-বই যখন প্রথম বের হয় তখনই আদি পাঠ। তারপর হঠাৎ-হঠাৎ করে নানা কারণে ফের ঐ একই বইয়ের পাতা ওল্টানো। আবার নতুন করে সদ্য পড়ে উঠলাম। কোনো কিছুর গুণাগুণবিচার কেবল ভালো-মন্দের নিরিখেই যে সর্বদা হবে, এমন তো নয়। আমি বলি, এ এক অসামান্য বই। ‘একাত্তরের দিনগুলি’র কথা বলছি। কেন অসামান্য? সে কি লেখক অসামান্য বলে? জাহানারা ইমাম যখন একই সঙ্গে নিজের জীবন ও পরিপ্রেক্ষিতে ইতিহাস মিশিয়ে এ-দলিল রচনা করছেন, তখনও তিনি দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের বেদনাপ্রতীক পরিনত হননি।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম

বাংলাদেশের যে-কোনো সাধারণ জায়া ও জননীর প্রতিনিধি হিসেবেও কেউ বিবেচনা করতে পারেন বৈকি জাহানারা ইমামকে। কেননা, ১৯৭১-এর পুরো বছর জুড়ে দেশপ্রেমী এক বাঙালি গৃহিণীর শঙ্কা ও অসহায়ত্ব, ক্রোধ ও অপমান, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার পাশাপাশি পরিবার-পরিজনকে নিয়ে আত্মরক্ষার উপায় উদ্ভাবন ইত্যাদিই তো এই দিনলিপির সারাৎসার। হোক-না এই বিশেষ ক্ষেত্রে মহিলাটি শহুরে, উচ্চশিক্ষিতা এবং উচ্চমধ্যবিত্ত গোত্রের একজন, তাতে কী! এ দেশের বাঙালির একাত্তরের অনুভূতি বলতে এগুলোই এবং সর্বত্রই গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে, সবখানেই; তফাৎ যা থাকতে পারে, আর থাকেও বৈকি, সে-সব শুধুই আয়তনগত, পরিমাণ বা মাত্রার, কখনোই গভীরতার নয়। ‘একাত্তরের দিনগুলো’ বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-সংগ্রামকে সম্বল করে বানিয়ে-তোলা কোনো উপাখ্যানও হতে পারত, ইতিহাসখণ্ডের ভিত্তিতে কল্পিত কাহিনী উচ্চগ্রামের সাহিত্য হয়েছে এমন উদাহরণ দেশ-বিদেশের সাহিত্যে অজস্র ছড়ানো আছে। কিন্তু উদ্দেশ্য গল্প তৈরি করা ছিল না, সাহিত্য নির্মাণের অভ্যন্তরীণ আকুতি কিংবা স্বীকৃতি লাভের উচ্চাকাক্সক্ষাও পেছনে কাজ করেনি। তবে কেন এ-বই লেখা? আসলেই ‘লেখা’ কি? আমার মনে বিন্দুতম সন্দেহ নেই যে, তিনি আজও জীবিত থাকলে এমন কথা শুনে ক্ষুব্ধ, বিষণ্ন ও অপমানিত বোধ করতেন। ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ থেকে ১৭ই ডিসেম্বর অবধি যাপিত এক অস্থির, শ্বাসরোধী, অথচ স্বপ্নজাগর জীবনকে প্রতিটি দিন লিপিবদ্ধ করে যাওয়াকে কি কেউ ‘বই লেখা’ বলবে, না বলা উচিত? এই শুধুই এক ভয়ঙ্কর সময়কে অনাড়ম্বর প্রত্যক্ষতায় ধরে রাখার চেষ্টা। আমার জানা নেই, দিনলিপি লেখার অভ্যাস তাঁর প্রাত্যহিক কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল কি না। যদি থেকে থাকে, তা হলে সে অভ্যাসের সম্প্রসারণ হিসেবে এক সময়খণ্ডের বিবরণ এখানে লেখা হয়ে গেছে। কিংবা এমনও হতে পারে যে, জাহানারা ইমাম স্বজ্ঞা (intuition)- তাড়িত হয়ে ডায়রি লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, অর্থাৎ তাঁর ধীশক্তি ও অনুভবক্ষমতা ভেতরে-ভেতরে তাঁকে আগাম সঙ্কেত দিয়েছিল, ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে দেশের, জাতির এবং তোমার নিজেরও জীবনে, হিসাব রাখো, হিসাব রাখো।


কী অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুর সেই সব দিন। ‘একাত্তরের দিনগুলি’ পড়তে-পড়তে সেই তখনকার দিনগুলো সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। দিনগুলো তো নয়, কালখণ্ড, আমাদের আয়ুষ্কালের ভেতরেই চোখের সামনে এক ইতিহাসকে তৈরি হয়ে উঠতে দেখা। এ আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস। শুক্রবার ১৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে ডায়রিতে প্রথম বাক্য : ‘আজ ভোরে বাসায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তোলা হল।’ একটু পরেই বলছেন : ‘সারা ঢাকায় লোক রাখা যাচ্ছে না। এত বেশি রক্তের দাম দিতে হয়েছে যে কান্নার স্রোতে হাসি ডুবে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে।’

সেইসব দিন মনে পড়িয়ে দেয় এইসব পঙ্ক্তি। ৩রা মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিল পাকিস্তানের ভেতরে বসেই। মা জাহানারা ইমামের প্রশ্ন ছেলের কাছে, ‘এই মুহূর্তে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়াটা ভীষণ রিস্কি ব্যাপার না?’ ছেলে রুমীর জবাব, ‘রিস্কি নিশ্চয়। কিন্তু আম্মা, ঘটনার একটা নিজস্ব গতি আছে না? জলপ্রপাতের মতো। উঁচু পাহাড় থেকে যখন গড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে রুখতে পারে, এমন কোনো শক্তি নেই। আমাদের দেশের জনতা এখন এ জলপ্রপাতের মতো একটা অনিবার্য পরিণতির দিকে অত্যন্ত তীব্র বেগে ছুটে যাচ্ছে, একে আর বোধ হয় রোখা যাবে না।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ রুমী

জলপ্রপাত রোখা যায়নি; শুধু তাই নয়, তার রূপান্তর ঘটেছিল রক্তপ্রপাতেÑজনতার রক্ত, জাতি-ধর্ম-বৃত্তি-বয়স নির্বিশেষে এ দেশের মানুষের আত্মবলিদানের রক্ত। পাকিস্তানি জান্তার আসল চেহারা, ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহারের ভয়াবহ ফসল খানসেনাদের পশুত্ব ও বর্বরতা কীভাবে পুরো একাত্তর জুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল, মুক্তিফৌজ ও গেরিলা বাহিনীর দেশপ্রেম-সাহস-কূটবুদ্ধি ও শৌর্য-বীর্য, সাধারণ শান্তিকামী নির্বিরোধী ছাপোষা মানুষেরও রুখে দাঁড়ানো- সব মিলিয়ে ইতিহাসের সে এক বিরাট কর্মযজ্ঞ একাত্তরের ইতিহাস তৈরি করেছিল। রাজনীতি ও সমাজগতির অনিবার্যতায় ইতিহাসের মোগ ফিরছিল, ধর্মীয় রাজনীতিজাত পাকিস্তান থেকে ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক ইহজাগতিক (secular) বাংলাদেশের দিকে।

‘একাত্তরের দিনগুলি’ ইতিহাস নির্মাণের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ প্রত্যক্ষ করায়। মুক্তিযুদ্ধে জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ সন্তান রুমী, কলেজপড়ুয়া ছাত্রের কতই বা বয়স, শহীদ হয়েছে; তাঁর সজ্জন রুচিমান্ মিতবাক্ স্বামী শরীফ পাকিস্তানি খানসেনাদের অত্যাচার-নির্যাতনে ক্ষীণবল হয়ে শেষে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন ঐ যুদ্ধের ভেতরেই- সবই এক ব্যক্তিমানুষের জীবনে অশনিসম্পাত, যার ভার বাকি জীবন লেখিকাকে বয়ে বেড়াতে হবে। কিন্তু এই জীবন বা ভবিতব্য তাঁর একার নয়, সে-সময়ের প্রতিটি দেশবাসীরও।

একাত্তরের দিনগুলি

১৯৭১-এ স্বাধীনতা অর্জনের তিন যুগ পার হয়ে এসে যখন দেখতে পাচ্ছি আমরা, দেশবাসীই, কীভাবে ব্যর্থ করে তুলেছি আমাদের বাংলাদেশকে তখন উপলব্ধি করি কেন একাত্তরের স্মৃতিতে অবগাহন করে নিজেকে পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করা প্রয়োজন। বর্তমান প্রজন্মের কোনো স্মৃতি নেই ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-সংগ্রাম নিয়ে। এ দেশেরই শাসকবর্গ বিভিন্ন সময়ে নিজেদের স্বার্থে ইতিহাস বিকৃত করে উপস্থাপন করেছে উত্তরসূরী নবীন প্রজন্মের কাছে : পাঠ্য বইয়ে, রাজনৈতিক প্রচারগ্রন্থে, ভুল তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। সে-সব চক্রান্ত সফলও হয়েছে বলা চলেম কারণ- এর ফলে তরুণদের মনে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো গর্ববোধ, সংবেদনা, নাড়ির টান তৈরি হয়ে ওঠেনি। এর চেয়ে ভয়াবহ আত্মবিস্মৃতির পাপাচা আর হয় না।

বাংলাদেশ যদি কোনো নৈসর্গিক দুর্দৈবে পৃথিবীর বুক থেকে অবলুপ্ত না হয়, তা হলে সে বাঁচবে ১৯৭১-কে নিয়েই। এই তার ইতিহাস-নির্ধারিত ভবিতব্য। কিন্তু ইতিহাসের পথ তৈরি করে তো মানুষই। এখনকার বাংলাদেশের নষ্টে-যাওয়া মানুষ পথভ্রষ্ট ইতিহাসকে ঠিক রাস্তা বাতলে দিতে পারে একাত্তরকেই হৃদয়ে ধারণ করে।

‘একাত্তরের দিনগুলি’ সেদিকেই ইশারা মেলে রাখে।

 

  • হায়াৎ মামুদ, সাহিত্যিক ও অনুবাদ

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ