উপনিবেশে মিরান্দা : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

‘দি টেমপেস্ট ‘ নাটকটি ঝড়েরই কাহিনী বটে । সেখানে একটি নয়, একাধিক ঝড় ওঠে। এবং সবকিছুকে উল্টে পাল্টে দিতে চায় । বারাে বছর আগে একটি রাজনৈতিক ঝঞ্ঝা বয়ে গিয়েছিল মিলানের ওপর দিয়ে । মধ্যরাতে একটি অভ্যুত্থান ঘটে, ক্ষমতাচুত্য হন মিলানের দার্শনিক-ডিউক প্রসপেরাে । ভাঙাচোরা একটি জাহাজে তাঁকে তুলে দেওয়া হয়, যাতে সমুদ্রের নােনা পানিতে ডুবে তার মৃত্যু ঘটতে পারে । বারাে বছর পরে সেই এসপেরা নিজেই আরেকটি ঝড় তুলেছেন, সমুদ্রে। এটি প্রাকৃতিক। অভিনিবিষ্ট গ্রন্থপাঠে তিনি যাদুর অত্যাশ্চর্য শক্তি পেয়েছেন, তাঁর এখন ক্ষমতা আছে অশরীরী অনুগত দাস এরিয়েলের সাহায্যে যা ইচ্ছা তাই করবার। প্রসপেরাে ঝড় তুলেছেন প্রতিশােধ নেবেন বলে । জাহাজে করে যাচ্ছিলাে নেপলসের রাজা, সঙ্গে ছিল প্রসপেরো বিশ্বাসঘাতক নরাধম সেই ভ্রাতা যে অত্যুথান কাটিয়ে প্রসপেরােকে ক্ষমতাচুত্য করে এবং ভাসিয়ে দেয় সমুদ্রে । প্রসপেরাে সুযােগ পেয়েছেন । তবে ঝড় তুলে ধ্বংস করে দেন নি জাহাজটিকে, সেটিকে নিয়ে এসেছেন তাঁর দ্বীপে ।

দ্বীপে এলেও ঝড়ের শেষ নেই । জাহাজের লােকগুলাে তাদের মধ্যে কে বাঁচল কে ডুবল তার হিসাব জানে না। নেপলসের রাজা এলেনসাে তার একমাত্র পুত্র ফার্ডিন্যান্ডকে খুঁজে পাচ্ছে না। ধরে নিয়েছে যে সে হারিয়ে গেছে চিরতরে। পুত্র ফার্ডিন্যান্ডও  জানে না পিতা এলেনসাের কি হয়েছে । সেও খুব অস্থির । প্রসপেরোর নিজের মনেও বিরাট চাঞ্চল্য। শত্রুকে পেয়েছেন হাতের মুঠোয়। কেবল যে ভ্রাতা এন্টনিও তা নয়, রাজা এলেনসােও তাঁর ঘােরতর শত্রু। দুজনের যােগসাজশে ঘটেছিল তার ক্ষমতাচুত্যি এবং দৈবকৃপায় এই দ্বীপে আগমন, যেখানে আজ তিনি তাঁর শত্রুদেরকে নিয়ে এসেছেন ।

কিন্তু আরাে বিষয় আছে। প্রসপোেের কন্যা মিরান্দা এখন বিবাহযােগ্যা; তার জন্য পাত্র দরকার। পিতা প্রসপেরাের বিশেষ উদ্বেগ ওই ব্যাপারেও। এলেনসাের পুত্র জেকুমার ফার্ডিন্যান্ড পাত্র হিসাবে খুবই যােগ্য। দুবৃত্ত পিতার এই সুদর্শন সন্তানটিকে তিনি জামাতা করতে আগ্রহী। ন্যায়বিচার করা প্রয়ােজন, প্রতিশােধও দরকার। আবার আবশ্যক রাজার সঙ্গে আত্ময়ীতার সম্পর্ক স্থাপন । প্রসপেরােও অস্থিরতার মধ্যে আছেন। ওদিকে রাজনৈতিক যড়যন্ত্রও চলছে । এই বিপদের মধ্যেও প্রসপেরাের কুলাঙ্গার ভ্রাতাটি তার আপন স্বভাব ভােলে নি। রাজভ্রাতা সেবেস্টিয়ানকে সে পরামর্শ নিয়ে এলেনসােকে খুন করে নেপলসের সিংহাসন জবরদখলের । এলেনসাের মেয়ের বিয়ে হয়েছে আফ্রিকায়, ছেলে গেছে হারিয়ে, এই তাে সুযােগ । হত্যা করাে এবং মালিক হও।

ষড়যন্ত্র চলছে প্রসপেরোর নিজের বিরুদ্ধে । প্রসপেরোর দুই ভৃত্যের একজন এরিয়েল, অপরজন ক্যালিবান। দুই বিপরীত স্বভাবের প্রাণী তারা। এরিলে অনুগত, ক্যালিবান বিদ্রোহী। ক্যালিবানরা ছিল এই দ্বীপের মালিক। প্রসপেরো এসে তাদেরকে উৎখ্যাত করেছেন। ক্যালিবানকে ভৃত্যে পরিণত করেছেন, যাদুবিদ্যার জোরে। সেই ক্যালিবান সুযোগ খুঁজছে প্রসপেরোকে হত্যা করার। জাহাজের মাতাল খানসামা স্টেফানোকে পেয়েছে, তাকে ফুসলাচ্ছে সে প্রসপেরোকে হত্যা করে দ্বীপের মালিক  হবার মন্ত্রণা দিয়ে।

এই যে এতো সব ঝড়ের ঘটনা এদের কোনটির জন্যই মিরান্দা দায়ী নয়। কিন্তু সবকটিরই ভুক্তভোগী সে। মিরান্দার বয়স যখন তিন, তখন মিলান থেকে উৎখাত হয়ে পিতার সঙ্গে অজানা গন্তব্যে যাত্রা করে সে। বাধ্য হয়ে। তার মা নেই, মারা গেছেন আগেই সঙ্গীসাথী আর কেউ নেই, পিতা ছাড়া। শেক্সপীয়রের এই নাটকটি অন্য সবার থেকে আলাদা। দূরদ্বীপবাসিনী একাকিনী এক কিশোরী। কালিদাসের শকুন্তলার মতো, কিন্তু আবার স্বতন্ত্রও। শকুন্তলার বাস অরণ্যে, মিরান্দা রয়েছে সাগরবেষ্টিত বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপে। শকুন্তলার সঙ্গিনী ছিল; অত্যন্ত প্রিয় বান্ধবী ছিল দুইজন; তার বন্ধুত্বও ছিল প্রকৃতির সঙ্গে। মিরান্দার সেসব কিছুই নেই। সঙ্গী-সাথী কেউ নেই আছে ক্যালিবান, যার দৃষ্টিতে লোলুপতা। একটি অতিবিষাক্ত, অত্যন্ত বিরূপ জগতে মিরান্দার বসবাস।

‘দি টেমপেস্ট’ নাটকটি অনায়াসে একটি ট্রাজেডি হতে পারতো। ট্রাজেডির সব উপাদান উপস্থিত সেখানে। কিন্তু ট্রাজেডি না হয়ে এটি যে কমেডি হয়েছে শেষ পর্যন্ত তার কারণ হচ্ছে প্রসপেরোর শক্তি। যেন ঈশ্বর তিনি এই দ্বীপে, একের পর এক অঘটন ঘটিয়ে চলেছেন, একের পর এক পরাস্ত করছেন বিপক্ষ শক্তিকে। অন্তরের প্রেরণার জোরে তিনি গ্রন্থপাঠ করেছেন, প্রস্থপাঠ করে যাদুবিদ্যার ক্ষমতা পেয়েছেন এবং সেই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েছেন বিরূপ পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর আপন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায়। শেক্সপীয়র সেই বিশেষ যুগের মানুষ যে-যুগ ছিল নবজাগরণের, ওই জাগরণ জ্ঞানকে জেনেছে শক্তি হিসাবে। প্রসপেরো সেই শক্তিই লাভ করেছেন, নিজের চেষ্টায়। একাগ্র অধ্যায়নে।

মিরান্দা একমাত্র নারী চরিত্র এই নাটক। নবজাগরণের ওই কালে পুরুষ যে নারীর সমঅধিকারে বিশ্বাসী ছিল তা কিন্তু নয়। মেয়েরা অধনস্তই বটে। ক্যালিবানের কাছে মিরান্দা কামনার বস্তু, অন্যকিছুর আগে। সেটাই স্বাভাবিক। ক্যালিবানের নামের মধ্যেই আছে মাংসলোলুপতার গন্ধ। ‘ক্যালিবানরা’ নরমাংস ভক্ষণ করে। ক্যালিবান বুঝি ওই ক্যালিবানেরই অপভ্রংশ। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ। মিরান্দা হচ্চে ক্যালিবানের নিষ্ঠুর প্রভু প্রসপেরোর কন্যা। আদরের ধন। প্রভুর ক্ষতি করতে চাইলে তার কন্যার ওপর শোধ নেওয়াটা একটা স্বাভাবিক উপায় বটে, প্রবলকে না পারো দুর্বলকে মারো। ক্যালিবানের ইচ্ছা তা-ই করবে; প্রতিশোধ নেবে মিরান্দাকে দখল করবে এবং মিরান্দার সাহায্যে অসংখ্য ক্যালিবানের জন্ম দিয়ে ভরে দেবে এই দ্বীপ। হাজার হোক ক্যালিবান বন্য, তার আকাঙ্ক্ষা এরকমই হবে। কিন্তু সুসভ্য স্টেফানোও উত্তেজিত হয়েছে, মিরান্দার রূপের কথা শুনে। তারও লোভ মিরান্দাকে পাবার। ক্যালিবানের বেলায় তবু কামনার সঙ্গে প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারটা মিশে গিয়েছিল, রাজতরীর খানসামা মদ্যপান-বিলাসী স্টেফানোর তো কোন ক্ষতি করে নি মিরান্দা, কিম্বা  মিরান্দার পিতা। তবু এই পুরুষপুঙ্গবও মিরান্দা অভিমুখে ধাবিত হয়।

গঞ্জালো হচ্ছে ‘টেমপেস্ট’ নাটকে সবচেয়ে সুস্থ মানুষ, প্রায় ঋষি এবং অবশ্যই স্বাপ্নিক, কিন্তু তিনিও অন্তত একবার মেয়েদের সম্পর্কে পুরুষোচিত অশোভন উক্তি করেছেন। বেচারা মিরান্দা! সে নিরপরাধ। কারো সে কোন ক্ষতি করে নি, দায়ী নয় কোন অপকর্মের জন্য; কিন্তু সব বোঝা তার কাঁধেই। ভাঙা জাহাজে বাবার সঙ্গে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে সে তিন বছর বয়সে, বারো বছর কাটিয়েছে নির্জন দ্বীপে- নানান বিপদের মধ্য দিয়ে।

শেক্সপীয়রের কালে লোকে বিশ্বাস করতো যে, মানুষের মরদেহ চারটি উপাদান দিয়ে তৈরি-বায়ুম অগ্নি, মৃত্তিকা ও পানি। সব উপাদান সবার মধ্যে সমান মাত্রায় থাকে না। ইতরবিশেষ ঘটে। প্রসপেরোর দুই ভৃত্য দুই রকম। এরিয়েলের দেহে বেশি আছে বায়ু ও অগ্নি, সে মিশে থাকে বায়ুতে, তার তেজটা অগ্নির। ক্যালিবানকে বলতে হবে মাটি ও পানির আধিক্য দিয়ে প্রস্তুত; সে কর্দমাক্ত। কিন্তু মিরান্দাতে দেখি অতিসুন্দর ভারসাম্য। চারটি উপাদান চমৎকারভাবে সহঅবস্থান করছে, একটি ছাড়িয়ে যাচ্ছে না অপর তিনটিকে। প্রসপেরো যেভাবে রেগে যান মিরান্দা তা করে না। মিরান্দা শান্ত, অথচ অনমনীয়। প্রেমিকা, কিন্তু একেবারেই আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক নয়।

তরুণ-তরুণীর প্রেম শেক্সপীয়রের কমেডিতে প্রধান্য পায়, অনেক ক্ষেত্রে মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে, সে তো আমরা জানিই। ‘টেমপেস্ট’ নাটক প্রসপেরোকে নিয়েই। তিনিই প্রধান। প্রথম থেকে শেষ অবধি উপস্থিত তিনি। যখন দৃষ্টিগ্রহ্য নন, তখনও আছেন, পেছনে। কর্তৃত্ব তাঁর হাতেই। যা করার তিনিই করছেন; ওঠাচ্ছেন, বসাচ্ছেন। কিন্তু তবু এই নাটকের প্রধান ঘটনা প্রসপেরোর প্রতিশোধ নয়, প্রধান ঘটনা মিরান্দার সঙ্গে ফার্ডিন্যান্ডের সম্পর্ক।

তাদের বিয়ে হবে; কালে মিরান্দা রানী হবে নেপলসের এবং সেই ভুলটি করবে না যা প্রসপেরো করেছেন। একপেশে হবে না, ঝুঁকে পড়বে না একদিকে, অন্যসব দিককে অবজ্ঞা করে। প্রসপেরো দার্শনিক বটে, কিন্তু তিনি শাসনকর্তা হিসাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারেন নি। অপারগ হয়েছেন। গ্রন্থাগারকেই নিজের রাজ্য মনে করতেন। খুব বেশি আস্থা রেখেছিলেন কনিষ্ঠ ভ্রাতায়, সেই ভ্রাতা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ক্ষমতাচুত্য করেছে প্রসপেরোকে। হত্যাই করতো, পারে নি প্রসপেরোর জনপ্রিয়তার কারণে। কিন্তু তেমন ব্যবস্থা নিয়েছিল যাতে মৃত্যু ঘটে প্রসপেরোর, ভাসিয়ে দিয়েছিল অগাধ সমুদ্রে।

মিরান্দা জানে এসব ঘটনা। তার মধ্যে সেই পূর্ণতা আসবে যা তার পিতার মধ্যে ছিল না। অন্যসব গুণ থাকা সত্ত্বেও ছিল না।

দেখাসাক্ষাতের ব্যবস্থাটা অবশ্য প্রসপেরোই করে দিয়েছিলেন। ফার্ডিন্যাণ্ডকে পাত্র হিসেবে নির্বাচন তিনিই করেছেন, মনে মনে। দু’জন যাতে দু’জনের মুখোমুখি হয় সে আয়োজন তাঁরই করা। পরীক্ষা করেছেন তাদের ভালবাসার গভীরতাকে। সহজলভ্য করেন নি একজনকে অপরজনের জন্য। যেন ছকে আঁকা সবকিছু। একটি দৃশ্যে আমরা দেখি ফার্ডিন্যাণ্ড ও মিরান্দা দাবা খেলছে। প্রসপেরোও ওই খেলাই খেলছিলেন এই দু’টি তরুণ-তরুণীকে নিয়ে। সংসারে তার মিরান্দা ছাড়া আর কেউ নেই। এক সময় স্ত্রী ছিলেন জীবিত, এখন নেই। এখন আর একতৃতীয়াংশ নয়, জীবনের অর্ধাংশ জুড়েই মিরান্দা। তারও অধিক আসলে, বিপজ্জনক সেই সমুদ্র যাত্রায় মিরান্দাই তাঁকে জীবিত রেখেছিল; দ্বীপে এসে নিজের যতোটা নয় মিরান্দার নিরাপত্তার কথা তারচেয়ে বেশি করে ভেবেছেন। এই যে এখন বিয়ে হয়ে যাচ্ছে মিরান্দার, নিজের রাজ্য ফেরত পেতে যাচ্ছে প্রসপেরো, এখন তিনি কী করবেন? এখন তাঁর প্রতি তিনটি চিন্তার একটিচ হবে মৃত্যুবিষয়ক। পিতা-কন্যার সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রসপেরো-মিরান্দা ও অনন্য।

কিন্তু মিরান্দা পুতুল নয়, ছকো বন্দী ঘুঁটি নয়। সে অত্যন্ত জীবন্ত। নাটকের সবচেয়ে উজ্জ্বল, সর্বাধিক প্রণোচ্ছ্বল মানুষটিই এই মিরান্দাই। তার মিরান্দা নামটি যেন ‘এডমিরেবল’-এর একাংশ দিয়ে তৈরি। সে যতোটা এডমিরেবল তার বিজ্ঞ পিতা প্রসপেরোও ততটা নন। প্রসপেরো প্রসপারিটির দ্যোতক। তিনি উন্নতি করেন, উন্নতি আনেন; কিন্তু তত প্রশংসনীয় নন, কন্যা মিরান্দা যতটা।

মানুষ বলতে মিরান্দা তো শুধু তার পিতাকেই চিনতো। ক্যালিবান মানুষের মতো ঠিকই কিন্তু পুরোপুরি মানুষ নয়। ওই যে মানুষের মতো কিন্তু ঠিক মানুষ নয়, এটিই অসুবিধার ব্যাপার ক্যালিবানের জন্য, মিরান্দার জন্যও। মানুষ হিসাবে তাকে গ্রহণ করা যায় না, অথচন নিজের ‘মনুষ্যত্ব’ সে নানা ভাবে প্রকাশ করতে সচেষ্ট থাকে। তার কাছে কর্তৃত্বকারী অভিমান; উত্তরাধিকার সূত্রে দ্বীপের মালিক তো সে-ই’ জবরদখলকারী প্রসপেরো নয়।

অন্য মানুষের অস্তিত্বের ব্যাপারটা মিরান্দা প্রথম জানলো ওই ঝড়ের ভেতর দিয়েই। সমুদ্রে বায়ু বইছে উথাল-পাথাল। বিপদে পড়েছে একটি জাহাজ। তীর থেকে দেখা যায়। জাহাজটি ডুবে যাবে মনে হয়। অচিরেই মারা পড়বে আরোহীরা সবাই। এই দৃশ্য দেখে অশ্রু সংবরণ কঠিন হয়েছে মিরান্দার পক্ষে। করজোড়ে অনুনয় করছে পিতার কাছে তাদের বিপদমুক্তির জন্য। কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘আপনি কিছু করুন। ওদের বাঁচান।’ বলছে ,‘ আমার যদি ক্ষমতা থাকতো তাহলে সমুদ্রকে ডুবিয়ে দিতাম মাটির নিচে, যাতে সে জাহাজটিকে গিয়ে খেয়ে ফেলতে না পারে।’

জাহাজে কে আছে, কারা আছে, মিরান্দা তার কিছুই জানে না। জানে মানুষ আছে, তাদের জন্য তাই তার কান্না। পিতা তাকে আশ্বস্ত করলেন। বললেন, ‘ঠান্ডা হও, ভয়ের কোন কারণ নেই।’ তারপরে সেই কাহিনীটি মিরান্দাকে বলতে শুরু করলেন যেটি বলি বলি করেও এতোদিন বলা হয় নি। আজ সেটি বলবেন। কেননা আজ ওইসব ঘটনার অনুঘটকেরা ওই জাহাজে রয়েছে। এ কাহিনী মিরান্দার জানা প্রয়োজন। এর সঙ্গে সে নিজেও জড়িত। কিন্তু আমরা দেখি, যেমন দেখেন তার পিতা, যে মিরান্দা অতীতের চেয়ে বর্তমানকে নিয়েই অধিক চিন্তিত। কাহিনী সে শুনেছে, কিন্তু তাকিয়ে আছে সমুদ্রের পানে; কী হলো মানুষগুলোর, জানতে ও বুঝতে চাইছে। অন্যমনষ্ক সে ওই চিন্তায়।

মিরান্দার সঙ্গে ফার্ডিন্যান্ডের যখন প্রথম চোখ চাওয়া-চাওয়ি তখন ঘোরতর বিস্ময় উভয়ের মধ্যে। মিরান্দা তো এমন পুরুষ আর কখনো দেখে নি। তার বিশ্বাস হয় না। প্রাণীটি মানুষ নাকি দেবদূত? দেখছে অশরীরী কোন প্রাণী মানুষের দেহ ধরে এসেছে। কিন্তু মানুষের মতো ভঙ্গি দেখছে সে ফার্ডিন্যাণ্ডের চোখে মুখে। এর ব্যাখ্যা কী? ফার্ডিন্যান্ডেরও একই জিজ্ঞাসা। হ্যাঁ, অনেক মেয়েই দেখেছে সে তার দেশে, কিন্তু এমনটি তো আর কখনো দেখে নি। এতো মানবী নয়, দেবী নিশ্চয়।

পিতা প্রসপেরো খুশি হয়েছেন। যেমনটি আশা করেছিলেন তেমনটি ঘটেছে। কিন্তু তবু কন্যার পিতা তিনি; অত সহজে সন্তুষ্ট হবেন না, পরীক্ষা করে দেখবেন। কন্যাকে বললেন, ‘ক্যালিবানকে ছাড়া অন্যপুরুষ মানুষ তুমি কখনো দেখ নি তো, তাই অমন উচ্ছ্বসিত হচ্ছো। সংসারে এমন অনেক সুদর্শন পুরুষ আছে যাদের তুলোনায় এ লোক ক্যালিবান ছাড়া অন্যকিছু নয়।’ তা হোক, মিরান্দার উচ্চাশা নেই; ফার্ডিন্যাণ্ডই যথেষ্ট, তার নিজের জন্য।

প্রসপেরো রুদ্ররূপ ধারণ করেন। বাজিয়ে দেখবেন ছেলেটিকে। তার যোগ্যতা কতোটা; আবেগটা তার গভীর নাকি হালকা। খুব করে শাসিয়ে বলছেন, ‘জানি তুমি কেন এসেছো এই দ্বীপে। শত্রু পক্ষের চর তুমি। খবর নিতে এসেছো। তোমার ইচ্ছা দ্বীপটি দখল করবে। এর জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হবে।’ এমন অন্যায় কথা শুনে রেগে যায় ফার্ডিন্যান্ড, তলোয়ার খুলতে চায়। মিরান্দা অনুনয় করে তার পিতাকে, করুণা করতে।

কিন্তু প্রসপেরো শুনবেন না। শাস্তি দিলেন ভরদুপুরে লাকড়ি এনে স্তূপ করার। রাজার ছেলে, কঠিন রোদে এমন শ্রম যে করবে সে অভ্যাস বা শিক্ষা তার নেই। তাকে পরিশ্রম করতে দেখে মিরান্দা কাতর হয় দুঃখে ও সহানুভূতিতে। বলে, ‘আমি করে দিই আপনার কাজ।’ ফার্ডিন্যান্ড বলে, ‘পাগল, আপনি করবেন কষ্ট, আর ইম করবো বিশ্রাম, তার আগে বরঞ্চ আমার মৃত্যু হোক।’ মিরান্দা বলে, ‘বিশ্রাম নিন, পিতা এখন ঘুমাচ্ছেন, দেখতে পাবেন না।’ ফার্ডিন্যান্ড তেমন ফাঁকিবাজিতেও সম্মত নয়। এর আগে স্বগতোক্তিকে বলেছে সে, ‘কাজটা শক্ত কিন্তু যার জন্য করছি এ কাজ সে মেয়েটি আমাকে জীবন্ত করে তুলেছে, আমার সব কষ্টকে পরিণত করেছে অপরিসীম আনন্দে।’

মিরান্দা বলে, ‘নআমি আপনার দাসী হবো।’ ফার্ডিন্যান্ড জানায় হবে মিরান্দার অতিনুগত ভৃত্য। একে অপরের জন্য দু’জনেই প্রস্তুত আত্মত্যাগে। গভীর তারা, বয়স যদিও অল্প। আত্মস্বার্থসর্বস্বতার যে আদর্শ নেপলসে-মিলানে প্রতিষ্ঠিত, যার শিকার হয়েছেন প্রসপেরো ও তাঁর কন্যা, সেই আদর্শের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে, এই দু’জন, বিষাক্ত পরিবেশে তারা স্বাস্থ্যের বার্তা। ক্যালিবান বন্য ও হিংস্র, কিন্তু নেপলসের মানুষেরা ক্যালিবানেরও অধম। তারা লোভী। তাদের সভ্যতায় ভাই বঞ্চিত করে ভাইকে, উদ্যোগ নেয় হত্যাকান্ডের। মিরান্দা ও ফার্ডিন্যান্ড সতুলে ধরে বিপরীত আদর্শ, প্রেমের ও ত্যাগের।

প্রসপেরো অপরাধীদের শাস্তি দিতে পারতেন। হাতের মুঠোয় পেয়েছিলেন বিশ্বাসঘাতকতা ভ্রাতাকে, ভ্রাতার সহযোগী নৃপতি এলেনসোকে। কিন্তু তা তিনি দিলেন না। ক্ষমা করে দিলেন। কেননা, দেখলেন তাঁরা প্রায় সবাই অনুতপ্ত। তাছাড়া এলনসোকে তো তাঁর প্রয়োজনই হবে, কন্যার শ্বশুর হিসাবে। কিন্তু ওই মানুষগুলো কি আদৌ বদলাবে? নাটকের শেষ দিকে আশাবাদী গঞ্জালো বলেছেন, ‘যা সব ঘটলো তাতে লাভ হলো এটা যে, নিজেরা নিজেদের চিনতে পারলাম।’ কথাটা তো ঠিক।

তা চেনা তো গেলো কিন্তু বদলানো যাবে কি? না, তেমনটা আশা করা কঠিন। তবে সুখের বিষয় এটাই যে, নতুন একটি প্রজন্ম এসেছে এগিয়ে। মিরান্দা হাত ধরেছে ফার্ডিন্যান্ডের, ফার্ডিন্যান্ড মিরান্দার। এ এক নতুন জন্ম।

তারা হয়তো ভিন্ন রকমের মানুষ হবে, কেননা তাদের জন্য শিক্ষণীয় রয়েছে পূর্বজন্মের নিষ্ঠুরতা ও পারস্পরিক বিদ্বেষ। বুঝতে তারা যে, ও পথে যেতে নেই। মিরান্দা জানবে এমনকি তার অতিমহৎ পিতার মধ্যেও ভ্রান্তি ছিল এবং জানবে এই সত্যও যে, পরিবেশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে নেই। তার পিতা আত্মসমর্পণ করেন নি, করলে কবে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো; দ্বীপে পৌঁছাবার আগেই, কিম্বা পরে। মিরান্দা শিক্ষা পেয়েছে পিতার কাছে এবং শত্রুদের কাছেও। ভালো-মন্দকে আলাদা করে চিনতে শিখেছে। এই শিক্ষা ট্রাজেডির নায়ক নায়িকারাও পায়; কিন্তু শিক্ষা পাবার পর তারা আর বেঁচে থাকে না। মিরান্দা থাকবে; রূপকে নয় কেবল, জীবনেও। আশার জায়গাটা ওইখানেই, অতোটাই।

 

  • সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ