(প্রথম পর্ব)
‘জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে শুধু আপন বিশ্বাসই নয়, সকল মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। সকল ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা দরকার প্রতিটি জ্ঞান পিপাসু মানুষের। শুধু সীমাবদ্ধ পরিমণ্ডলে আবদ্ধ হলে চলে না। সীমানাকে অতিক্রম করে যেতে হবে ক্রমান্বয়ে। এর মধ্যেই ক্রমশ অতিক্রম করা যাবে নিজেকে।’
কথাগুলো দার্শনিক, বস্তুবাদী চিন্তাবিদ আরজ আলী মাতুব্বরের।
এ উক্তির বয়সও অর্ধশতক পেরিয়েছে। তবে এর পরেও অধিকাংশ মানুষের চিন্তার দ্বার খোলেনি। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এত বেশি গোঁড়ামি, অন্ধত্ব, সংকীর্ণতা ভর করেছে; যা খুবই হতাশাজনক। আর এটি যে শুধু আমাদের দেশের কথা এমনও নয়। অনেক শিল্পোন্নত দেশেও আমরা আজ অসহিষ্ণুতা বাড়তে দেখছি। এ রকম হতাশাময় অবস্থায় আরজ আলী মাতব্বরের উক্তিগুলো ‘অন্ধকারে আলো জ্বেলে দেওয়ার’ মতো।
১৯০০ সাল। ১৭ ডিসেম্বর। পৃথিবীর আলো-ছায়া দেখে প্রথম চিৎকার দেন একটি শিশু। হয়তো জন্মের পর চিৎকারের জোরালো ধ্বনিই আজও অনেক মানুষকে উদ্যমী রাখছে। বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়ার পথ দেখাচ্ছে।
১২১ বছর আগে জন্মেছিলেন আরজ আলী মাতুব্বর। ১২১ বছর পর তাঁর মতো একজন স্বশিক্ষিত, দার্শনিক, বস্তুবাদী চিন্তক পেতে হলে লণ্ঠন হাতে নিয়ে মাসের পর মাস খুঁজে বেড়াতে হবে। সাধারণ একটি গ্রামে জন্ম এবং সেই গ্রামের মক্তবে কিছুকাল পড়াশোনা করেন তিনি। যেখানে জ্ঞানের দরজা বন্ধ ছিল। ধর্মীয় জ্ঞানের নামে ছিল মুখস্থ বুলি।
মানুষ নিজ মেধা-মননের জোরেই ভয়কে জয় করেন। পৃথিবীর ইতিহাস তা-ই বলে। আরজ আলী আপ্রাণ চেষ্টায় জ্ঞান লাভ ও তার বিকাশের মধ্য দিয়ে পর্যায় ক্রমে বস্তুবাদী দর্শনকে ধারণ করে হয়ে উঠেন চিন্তক, দার্শনিক। সমাজ-রাষ্ট্র তাঁর পক্ষের শক্তি ছিল না। না ছিল বিত্ত, প্রতিপত্তি। তার যা ছিল, তা হলো ইচ্ছাশক্তি। তিনি সাধনাকে জীবনে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
একটি কথা আমরা বারবার শুনে অভ্যস্ত যে, পরিবেশই সংগ্রামী, লড়াইয়ের মনোভাব তৈরি করে। আরজ আলী মাতুব্বরের ক্ষেত্রেও তার প্রমাণ পাওয়া যায়। সংগ্রামী জীবনের বাস্তবতাই তার চিন্তাশীলতার বিকাশে ইন্ধন জুগিয়েছিল। শত বছর আগে এ রকম দুঃসাহস দেখানোর ইতিহাসই বলে দেয়, তিনি কতটা সংগ্রামী চিন্তা ধারণ করতেন।
কিশোর বয়সে মাকে হারান তিনি। পৃথিবীর সবচেয়ে আবেগের নাম ‘মা’। সেই মাকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে যান। মুহূর্তেই চিন্তার জগতে প্রবেশ করে, তাঁর মায়ের কোনো ছবি নেই। অর্থাৎ জীবিতকালে তাঁর কোনো ছবি তোলাই হয়নি। এ বিষয়টি তাঁর চিন্তা জগতকে আঘাত করতে থাকে, নিজেকে নিজে হাজারটা প্রশ্ন করতে থাকেন। তখনই চট করে মাথায় বুদ্ধি আসে, মৃত মায়ের ছবি তুলে রাখতে হবে।
এটি ১৯১৫ সালের কথা। অর্থাৎ ১০৬ বছর আগের কথা। একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া শুধু দুঃসাহসের ব্যাপার নয়; রীতিমতো অন্যায় করার মতো ঘটনা। যেখানে একবিংশ শতাব্দীতে এসে মৃত মানুষের ছবি তোলা নিয়ে হাজারও ধর্মীয় ও সামাজিক বাধার মুখে পড়তে হয়।
বরিশাল শহর থেকে ফটোগ্রাফার এনে মৃত মায়ের ছবি তোলেন আরজ আলী মাতুব্বর। এটি মুহূর্তেই পাড়া থেকে মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে। ছিঃ ছিঃ রব উঠে। মায়ের লাশকে জানাজা পড়াতে অস্বীকৃতি জানায় মসজিদের ইমাম। সবার কথা একটাই, এটা ভারী অন্যায় কাজ হয়েছে। এ পাপের শাস্তি হবে! আরজ আলী খানিকটা অসহায়কর অবস্থায় পড়ে গিয়েও, বারবার অনুরোধ করতে থাকেন। অন্যায় করলে আমি করেছি, মৃত মা তো কোনো অন্যায় করেনি! তবুও ধর্মের ফেরিওয়ালাদের মন গলেনি।
এটি একটি ঘটনা; কিন্তু এই ঘটনাই তাকে আরও বেশি ধর্ম, কুসংস্কার সম্পর্কে জানতে উৎসাহী করে তোলে। জ্ঞানের দরজা প্রসারিত করার জন্য কী কী করণীয়, তার পেছনে ছুটতে থাকেন তিনি। হয়ে উঠেন একজন আরজ আলী মাতুব্বর… (চলবে)
  • লাবণী মণ্ডল : লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট