আরজ আলী মাতুব্বর জ্ঞান ও চিন্তাশীলতার জিজ্ঞাসা

(শেষ পর্ব)
প্রশ্নহীন আনুগত্য যে অন্ধবিশ্বাসকেই জাগ্রত করে, চিন্তাশীল বিকাশ রুদ্ধ করে- সে কথা আরজ আলীর মাতুব্বর খুব দৃঢ়ভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। যে কারণে তার ছিল অপ্রতিরুদ্ধ জিজ্ঞাসা। এর মধ্যে অন্যতম ধর্ম ও ধর্মের ব্যাখ্যার প্রতি জিজ্ঞাসা।
ধর্ম গ্রন্থ বা শাস্ত্র এবং জনগণের মধ্যে তার অবস্থান সবসময় এক রকম হয় না। তেমনটি হলে কোনো ধর্মের একাধিক তরিকা দেখা যেত না। সর্বত্র, সর্বকালে একটি ধর্ম একইরকম হতো। অথচ আমরা দেখি, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-ভৌগোলিক পার্থক্যের কারণে একই ধর্ম বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের বয়ান হাজির করেছে। ধর্ম ও জনগণের মাঝে এর অবস্থান নিয়েই আরজ আলী মাতুব্বরের আগ্রহ ছিল। এটি ছিল তার গবেষণা ও জিজ্ঞাসার অন্যতম প্রধান বিষয়।
আরজ আলী প্রশ্ন তুলেন- ধর্ম আর মানুষ কে কাকে তৈরি করে, কে কাকে পালন করে? নিজেই এর জবাব দিয়েছেন, ‘ধর্ম মানুষকে পালন করে না, বরং মানুষ ধর্মকে পালন করে এবং প্রতিপালনও।’ তিনি আরও বলেন, “সাধারণত আমরা যাহাকে ‘ধর্ম’বলি তাহা হইল মানুষের কল্পিত ধর্ম।” ধর্ম প্রবর্তকদের তিনি অভিহিত করেন ‘মহাজ্ঞানী’ হিসেবে যারা যুগে যুগে স্রষ্টার নামে ‘মানুষের সমাজ ও কর্মজীবনের গতিপথ’ দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, এর ফলেই সৃষ্টি হয়েছে অনেক ধর্ম ও মতবিভেদ।
আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ভৌগোলিক কাঠামোর কারণে ধর্মের বহু রূপ দাঁড়িয়েছে। অনেক ধর্ম বিলুপ্ত হয়েছে। কোনো কোনো ধর্ম আবার সংশ্লেষিত হয়েছে; কোনোটি অন্য ধারার সঙ্গে মিশে গেছে। ‘পৌত্তলিকতা’ প্রশ্নে মতভিন্নতা থাকলেও ধর্মতত্ত্ব ও ধর্মাচার ব্যাখ্যায় আরজ আলী মাতুব্বর বিভিন্ন ধর্মের সারবস্তুতে ‘অমিলের চেয়ে মিলই বেশি’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বৈদিক বা আর্য ধর্মের সঙ্গে আরবের একেশ্বরবাদী ধর্মের মিল দেখিয়েছেন।
আরজ আলী যে মিলগুলো দেখিয়েছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো-
১. ঈশ্বর এক- একমেবাদ্বিতীয়ম (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)
২. বিশ্ব-জীবের আত্মাসমূহ এক সময়ের সৃষ্টি
৩. মরণান্তে পরকাল এবং ইহকালের কর্মফল পরকালে ভোগ
৪. পরলোকের দুটি বিভাগ- স্বর্গ ও নরক (বেহেস্ত-দোজখ)
৫. স্বর্গ সাত ভাগে এবং নরক সাত ভাগে বিভক্ত
৬. স্বর্গ বাগানময় এবং নরক অগ্নিময়
৭. স্বর্গ ঊর্ধ্বদিকে অবস্থিত
৮. পূণ্যবানদের স্বর্গপ্রাপ্তি এবং পাপীদের নরকবাস
৯. যমদূত (আজরাইল) কর্তৃক মানুষের জীবনহরণ
১০. ভগবানের স্থায়ী আবাস ‘সিংহাসন’
১১. স্তব-স্তুতিতে ভগবান সন্তুষ্ট
১২. মন্ত্র (কেরাত) দ্বারা উপাসনা করা
১৩. মানুষ জাতির আদিপিতা একজন মানুষ- মনু (আদম)
১৪. নরবলি হইতে পশুবলির প্রথা প্রচলন
১৫. বলিদানে পূণ্যলাভ (কোরবানি)
১৬. ঈশ্বরের নামে উপবাসে পূণ্যলাভ (রোজা)
১৭. তীর্থভ্রমণে পাপের ক্ষয়- কাশীগয়া (মক্কা-মদিনা)
১৮. ঈশ্বরের দূত আছে ফেরেস্তা)
১৯. জানু পাতিয়া উপাসনায় বসা
২০. সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত (সেজদা)
২১. করজোড়ে প্রার্থনা (মোনাজাত)
২২. নিত্যউপাসনার নির্দিষ্ট স্থান- মন্দির (মসজিদ)
২৩. মালা জপ (তসবিহ পাঠ)
২৪. নির্দিষ্ট সময়ে উপাসনা করা- ত্রিসন্ধ্যা
২৫. ধর্মগ্রন্থপাঠে পূণ্যলাভ
২৬. কার্যারম্ভে ঈশ্বরের নামোচ্চারণ
২৭. গুরুর নিকট দীক্ষা
২৮. স্বর্গে গণিকা আছে- গন্ধর্ব, কিন্নরী, অপ্সরা (হুর-গেলমান)
২৯. উপাসনার পূর্বে অঙ্গ ধৌত করা (অজু)
৩০. দিকনির্ণয়পূর্বক উপাসনায় বসা বা দাঁড়ানো
৩১. পাপ-পূণ্য পরিমাপে তৌলযন্ত্র ব্যবহার (মিজান)
৩২. স্বর্গগামীদের নদী পার হওয়া- বৈতরণী (পুলসিরাত)
জ্ঞান অর্জন ও জিজ্ঞাসা বা প্রশ্ন করার ক্ষমতা একে-অপরের উপর নির্ভরশীল। আরজ আলী মানুষের চিন্তার বিকাশে বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। তিনি অন্ধ আনুগত্যের স্থলে প্রশ্ন করতে আগ্রহী করেছেন; মানুষের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছেন।
আজ থেকে ১০০ বছর আগে এসব প্রশ্ন আরজ আলী মাতুব্বর একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে উত্থাপন করেন, তখন তার লড়াইয়ের পথ সহজ ছিল না। সে সময়কার রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তিই ছিল ধর্ম। যে ব্যবস্থাপনা থেকে আমরা একবিংশ শতাব্দীতে এসেও মুক্ত নয়। এক অজপাড়াগাঁয়ে বসে লড়াই করা এবং তা মানুষের ভেতরে ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে রাষ্ট্রের চক্ষূশূল হয়ে উঠেন তিনি।
ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্র তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে গ্রেফতার করে। রাষ্ট্রের চরিত্রগুলো খুব পাল্টাইনি। আমরা এখনো দেখি ফেসবুকে সামান্য একটি স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে কেউ মাসের পর মাস জেল খাটছেন। ধর্মীয় উন্মাদনায় পাল দিয়ে অনেকেই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিল করছেন। বাউল-ফকির-সুফি মতাদর্শ ধর্মবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হলে কথিত ধর্মনিরপেক্ষতা তখন মুখ লুকিয়ে থাকে। ভিন্ন চিন্তা, ভিন্নমত দমন ও স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। এ রকম একটি সমাজে বাস করে, আরজ আলীর মতো একজন দার্শনিকের স্বপ্ন দেখা অনেকটাই ‘আকাশের চাঁদ’ ছোঁয়ার মতো! যে কারণে আজ ‘আরজ আলী’দের অবস্থা আরও বেশি বেগতিক।
বিভিন্নভাবে তাঁর মুক্তিচিন্তা স্তব্ধ করে দেওয়ার চিন্তা করে রাষ্ট্র। শাণিত চেতনা দমিয়ে রাখা দুষ্কর। যদিও তিনি মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে বের হন; কিন্তু ওই চেতনাই তাঁকে আবারও জিজ্ঞাসার সম্মুখীন করে। তবে তিনি বৃহত্তর স্বার্থেই গোপনীয়তা অবলম্বন করেন। আত্মরক্ষার্থে তাঁকে অনেকসময় ‘বোরকা’র মতো পোশাকে ছদ্মবেশ ধারণ করতে হয়েছে! তবুও থেমে যাননি! বোরকা পরিধান করেই লাইব্রেরিতে যাওয়া-আসার কাজ অব্যাহত রেখেছিলেন।
আমাদের সমাজে এখনো প্রশ্ন করাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। আরজ আলীর বিশিষ্টতা এখানেই- তিনি এই ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। আরজ আলী মাতুব্বর লিখেছেন, ‘এলোমেলোভাবে মনে যখন যে প্রশ্ন উদয় হইতেছিল, তখন তাহা লিখিয়া রাখিতেছিলাম, পুস্তক প্রণয়ণের জন্য নহে, স্মরণার্থে। ওগুলি আমাকে ভাসাইতেছিল অকূল চিন্তা-সাগরে এবং আমি ভাসিয়া যাইতেছিলাম ধর্মজগতের বাহিরে।’
এর কিছুদিন পরই অল্পদিনের মধ্যেই প্রচারিত আরজ আলীকে ‘নাস্তিক’ বলে প্রচারণা শুরু হয়। ১৯৫১ সালে (বাংলা ১৩৫৮ সাল) গ্রেফতার করা হয় আরজ আলীকে। রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় কর্তাব্যক্তিদের তিনি একটি প্রশ্নের তালিকা দেন। জবাবে সন্তুষ্ট হলে তিনি ধর্মগুরুদের পথে যোগ দেবেন বলেও প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন; কিন্তু যাদের কাছে ধর্ম মানে প্রশ্নহীন আনুগত্য, অথবা ধর্মের নামে যাদের ব্যবসা ও রাজনীতি চলে, তারা কি করে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলবে, বা প্রশ্নের উত্তর দেবে! আরজ আলী বলেন, ‘করিম সাহেব চলিয়া যাইবার পরে আমি পাইয়াছিলাম কম্যুনিজমের অপরাধে আসামী হিসাবে ফৌজদারী মামলার একখানা ওয়ারেন্ট, কিন্তু আমার প্রশ্নগুলির জবাব আজও পাই নাই।’ উল্লেখ্য, পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রের কাছে নাস্তিক আর কমিউনিস্ট সমার্থক ছিল। এ সময়ে এসেও রাষ্ট্রের এ ব্যাখ্যা খুব বেশি পাল্টায়নি।
১৯৫১ সালের ১২ই জুলাই কোর্টে জবানবন্দী দিতে গিয়ে আগের প্রশ্নগুলোই সুসংগঠিত আকারে ‘সত্যের সন্ধান’ নামে তিনি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, “‘সত্যের সন্ধান’-এর পাণ্ডুলিপিখানার বদৌলতে সে মামলায় আমি দৈহিক নিষ্কৃতি পেলাম বটে, কিন্তু মানসিক শাস্তি ভোগ করতে হলো বহু বছর। কেননা তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আমাকে নির্দেশ দিলেন যে, ‘সত্যের সন্ধান’ বইখানা আমি প্রকাশ করতে পারবো না ও ধর্মীয় সনাতন মতবাদের সমালোচনামূলক অন্য কোনো বই লিখতে পারবো না এবং পারবো না কোনো সভা-সমিতিতে-বক্তৃতামঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বমত প্রচার করতে। যদি এর একটি কাজও করি, তবে যে কোনো অজুহাতে আমাকে পুনরায় ফৌজদারীতে সোপর্দ করা হবে। অগত্যা কলম-কালাম বন্ধ করে আমাকে বসে থাকতে হলো ঘরে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। এভাবে নষ্ট হয়ে গেলো আমার কর্মজীবনের অমূল্য ২০টি বছর। বাংলাদেশে কুখ্যাত পাকিস্তান সরকারের সমাধি হলে পর ‘সত্যের সন্ধান’ বইখানা প্রকাশ করা হয় ১৩৮০ সালে (১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ), রচনার ২২ বছর পর।”
  • লাবণী মণ্ডল : লেখক ও অ্যাক্সিভিস্ট

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ