আরজ আলী মাতুব্বর : জ্ঞান ও চিন্তাশীলতার জিজ্ঞাসা

(দ্বিতীয় পর্ব)
‘দর্শন’ শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ হলো জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ। দর্শন হলো চিন্তার বিজ্ঞান। এই জন্য দর্শনকে সকল বিষয়ের ‘আদি মাতা’ বলা হয়। সাধারণত ইংরেজি ‘ফিলোসফি’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘দর্শন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এই যে জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ, জানার কোনো শেষ নেই; এর সবকিছুই আরজ আলী মাতুব্বরের মধ্যে ছিল। তিনি নিজের জ্ঞানের পিপাসায় পিপার্সাত থাকতেন। জানার এবং বোঝার শেষ নেই বলে, তিনি মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত জানার জন্য ছুটেছেন।
শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পদার্পণ করেন আরজ আলী মাতুব্বর। পথটা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। আঁকাবাঁকা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর হয়নি, প্রাতিষ্ঠানিকতার পরোয়াও করেননি। যেখানে ডিগ্রি নিয়ে নিয়মিত রোজগার নিশ্চিত করাটাই সমাজের প্রতিভাবানদের প্রত্যাশ্যা, সেখানে তিনি জ্ঞানের পেছনে ছুটেছেন।
আরজ আলী মাতুব্বরের বাবা ছিলেন কৃষক। সেই কৃষিকাজ দিয়েই তাঁর কর্মজীবনের শুরু। এরপর শুরু করেন আমিনি পেশা। এই পেশায় তাঁর এত বেশি মনোযোগ ছিল যে, অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। আমিনি পেশার সূক্ষ্ম গাণিতিক ও জ্যামিতিক নিয়ম সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল অতুলনীয়। এ কাজটি অবশ্যই কৃষিকাজের অবসরে করতেন তিনি।
এরপর নিজের মেধা ও বুদ্ধির জোরে কিছুটা আর্থিক উন্নতি হয়। বাবার জমি যেগুলো জমিদার ও মহাজনদের কাছে বন্ধক ছিল, সেগুলো উদ্ধার করেন। তীব্র ইচ্ছাশক্তি মানুষকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ একজন আরজ আলী মাতুব্বর।
নিজের ভেতরের জিজ্ঞাসাই তাকে জ্ঞানের দিকে ধাবিত করেছে। বরিশাল লাইব্রেরি। খুব সমৃদ্ধ নয়। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল ওই লাইব্রেরি। ওখানেই ধ্যান-জ্ঞানে কাটত সময়। লাইব্রেরির সব বাংলা বই তিনি পড়ে ফেলেন এক ছাত্রের সহযোগিতায়। দর্শন ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়। তবে ওই লাইব্রেরি যেন তাঁর জিজ্ঞাসা আরও বাড়িয়ে দেয়। জ্ঞান তৃষ্ণা পূরণ করতে তাঁর জীবনে আশিবার্দ হয়ে আসেন বি এম মহাবিদ্যালয়ের দর্শনের শিক্ষক কাজী গোলাম কাদির।
আরজ আলীর জ্ঞানগর্ভ চিন্তায় তিনি রীতিমতো মোহিত হন। তাঁর সুপারিশেই আরজ আলী মহাবিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে বই ধার নেওয়া শুরু করেন। মানুষের অদম্য প্রচেষ্টাই জীবনকে বদলে দেয়, নতুন জীবনের ছোঁয়া দেয়। এই শিক্ষকের প্রভাব তাঁর জীবনে গভীরভাবে পড়ে। তাঁর বিকাশ রুদ্ধ করে এমন শক্তি কার! নিজের চেষ্টা এবং সাধনায় হয়ে ওঠেন একজন স্বশিক্ষিত মানুষ। বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম ও দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন তিনি। একাগ্রতাই তাঁকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যুগিয়েছে।
আরজ আলী মাতুব্বরের জীবনের ইচ্ছেটাই-বা কী ছিল? হ্যাঁ, তাঁর মতো একজন সংগ্রামী, পোড়খাওয়া মানুষ এত বেশি অধ্যবসায় ও পরিশ্রম করেছেন কেন- ভালো চাকরি-বাকরি পেতে না-কি নাম-ধামের জন্য? সে রকম কোনো চিন্তা-ভাবনা যে তাঁর ভেতর ছিল না, সেটি তাঁর জীবনেতিহাস থেকেই স্পষ্ট। ব্যক্তির প্রভাব বিস্তার এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠার তোয়াক্কা তাকে আবদ্ধ করতে পারেনি। যে কারণেই তিনি একজন আরজ আলী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে আগ্রহের জায়গা ছিল, প্রশ্ন করতে শেখা এবং প্রশ্নে ফেলা। ‘জিজ্ঞাসার জবাব চাই এবং নিজের ভেতর জমানো প্রশ্নগুলোর উত্তর চাই’ এই ব্রতই তাঁর ভেতরে আরও জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছিল। জিজ্ঞাসার জবাব চান বলেই, আরজ আলী পড়াশুনা-জানাবোঝার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন; কিন্তু শুধু পড়লেই হবে না, বিজ্ঞানচর্চার বিকাশ হতে হবে বলে তাঁর ভেতরে চিন্তা জাগে। এরপর থেকেই তিনি নিজের চেষ্টা অর্থাৎ একা একা বিজ্ঞানের নানা শাখা-প্রশাখায় ঢুকতে চেষ্টা করেন। কী অভাবনীয় ইচ্ছাশক্তি এবং অবিশ্বাস্য পরিশ্রমী মনোভাব থাকলে এ রকম লেগে থাকা যায়! এই অসামান্য পরিশ্রম এবং লেগে থাকাই তাঁর জীবনের সাফল্যের মূল কারণ হিসেবে নির্ণয় করা যায়। হাজার বছর ধরে চলে আসা বিশ্বাস ও প্রচলিত কুসংস্কার থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে জিজ্ঞাসার সঙ্গে জিজ্ঞাসার জবাব পাওয়া এবং নতুন নতুন জিজ্ঞাসার জন্ম দেওয়াই একমাত্র সাধনা। তাঁর এই জিজ্ঞাসার তীর যতই তীক্ষ্ম হয়, ততই তাঁর জ্ঞানের দ্বারা উন্মুক্ত হয়। চিন্তার গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করতে থাকেন আরজ আলী। প্রশ্নের জবাব পাওয়া-না পাওয়ার চেয়ে বড় প্রশ্ন, কেন এ প্রশ্ন এল, নিজের প্রশ্নকেই গভীরভাবে বোঝার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেন তিনি।
ধর্ম, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে নানামুখী জিজ্ঞাসা তাঁর জীবনকে পাল্টে দিয়েছে। আঘাতই মানুষকে পরিপক্ক ও শাণিত করে তোলে। মায়ের মৃত্যু এবং সমাজের ধিক্কারই তাকে একজন দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর হিসেবে গড়ে তোলে। যে দর্শনের আলোয় এখনো আলোকিত হচ্ছে হাজারো মানুষ। অন্ধকারের দরজা ভেঙে গড়ে তুলছে আলোর নিশানা।
চলবে…
  • লাবণী মণ্ডল : লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ