‘আদিবাসী বিয়েকথা’ গ্রন্থটি গবেষণামূলক। লেখক তাঁর লেখনীতে আদিবাসীদের সংস্কৃতি তুলে ধরেছেন। যেখানে আদিবাসী সমাজে বিয়ের উৎসব, বিয়ের লোকাচারগুলো কতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ, বিয়ের গান-নাচ, বিয়ে নিয়ে লোকবিশ্বাস ও মিথ, বিয়ের পোশাক, অলংকার, খাবার এবং বিয়ে বিচ্ছেদের রীতিগুলো কেমন? এসব তথ্য সংগ্রহ করতে লেখক আদিবাসী গ্রামগুলোতে ঘুরে বেড়িয়েছেন । যে কারণেই এটি একটি গবেষণা গ্রন্থ হয়ে উঠেছে।
‘গারো সমাজ মাতৃপ্রধান। সন্তানের বংশধারা মায়ের দিক থেকে গণনা করা হয় এবং মেয়েরাই পরিবারের সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী হয়। ছেলেরা সম্পত্তির আপনজন হিসাবে ওই পরিবারের একজন হয়ে যায় একটি গারো পরিবারে যদি পাঁচটি মেয়ে থাকে তবে সবাই সমভাবে পারিবারিব সম্পত্তির অধিকারিণী হয় না। পরিবারের একটি মেয়ে মাত্র মেয়ে সমুদয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী হয়। এদের সমাজে পরিবারের উত্তরাধিকার লাভকারী নির্বাচিত মেয়েকে ‘নকনা’ বলা হয়। পরিবারের প্রথমজন বা সবার ছোট মেয়েকে নকনা নির্বাচন করা হয়।…’ এটি বইয়ের ৩৮ পৃষ্ঠা থেকে তুলে ধরা হলো।
এভাবেই আদিবাসীদের জীবনেতিহাস তুলে ধরা হয়েছে গ্রন্থটিতে। যেখানে হাজার হাজার অজানা তথ্য রয়েছে। আমাদের ভবিষ্যৎপ্রজন্ম যদি কোনোদিন আদিবাসীদের নিয়ে গবেষণা করতে চান, তাহলে এটি হবে তাদের অন্যতম বই। কেন এ কথা বলছি, তা পড়ার পরই উপলব্ধি করা যাবে।
গ্রন্থটির প্রতিটি ঘটনা মৌখিক বিবরণ থেকে নেওয়া। যে কারণেই এটি একটি মূল্যবান গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত লাভ করতে পারে। এই গ্রন্থটিতে মোট ১৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির কথা রয়েছে। গারো, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, ম্রো, মণিপুরী, ওড়াও, হাজং, তুরিসহ ১৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিয়ে সংস্কৃতিসহ অন্যান্য বিষয়-আশয় এক মলাটে পাওয়াটা খুবই আনন্দের বিষয়।
বইটিতে সবচেয়ে বেশি ‘হাজং বিয়ে : ধর্ম মা-বাবা দাম্পত্য জীবনের ধারক-বাহক’ অধ্যায়টি রীতিমতো অবাক করেছে, এও হয় বলে বেশক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। অধ্যায়টিতে রাজার ছেলের তার সহোদর বোনের প্রেমে পড়েন, বিয়ে করবেন বলে জেদ ধরেন। রাজা তার জন্য অন্যত্র পাত্রী ঠিক করেন এবং বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হয়। কিন্তু রাজার ছেলে সে বিয়েতে রাজি নয়। বোন অঝোরে কাঁদতে থাকে। অশ্রুসজল চোখে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে। পুকুরের জল থেকে সে আশীবার্দের শক্তিতে আকাশের দিকে উঠতে থাকে। আকাশের মাঝে একসময় অদৃশ্য হয়ে যায়।
এটি হাজং জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রূপকথায় পরিণত হয়, আকাশ থেকে মাঝে মাঝে স্নানের দৃশ্য মনে হলে জলকণার স্মৃতিকে রাজার মেয়ে রংধনু তৈরিতে আধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সঙ্গে যা অনেকটাই মিলে। আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অনেকেরই বিয়ের রীতি-নীতি পাল্টে গেছে; কিন্তু এখনও আগলে রেখেছেন হাজং জাতিগোষ্ঠী পূর্বপুরুষদের জাতধর্মকে।
এভাবেই মানুষের জানার পরিধি বাড়ে। একজন আরেকজনকে জানানোর দায়ভার নেন। ‘আদিবাসী বিয়েকথা’ বইটি পড়ে বারবার মনে হয়েছে কত অজানা, কতকিছুই জানার রয়েছে!
‘আদিবাসী বিয়েকথা’ গ্রন্থটি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পাঠকের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামূলক বই হিসেবে স্থান করে নিবে বলে আশা করা যায়।
বই : আদিবাসী বিয়েকথা
লেখক : সালেক খোকন
প্রকাশক : কথাপ্রকাশ
মূল্য : ২৫০
  • পর্যালোচক :  লাবণী মণ্ডল, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, প্রান্তবার্তা