আজো ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি

‘ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে- এ-দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?’

এক
লাইনগুলো কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কবিতার। লিখেছিলেন ১৯৭৭ সালে। কবিতায় তিনি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কথা। সে সেময়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে এ দেশের অগণিত মা-বোন ধর্ষণ-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন; তা কারো অজানা নয়। এমনকি এই ধর্ষণ-নিপীড়নের মাত্রা এতটাই সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল যে, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্বয়ং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এ কে নিয়াজী পর্যন্ত বিচলিত ছিলেন। বিশেষভাবে তিনি বিচলিত বোধ করেছেন সেনা সদস্যদের মধ্যে ধর্ষণের প্রবণতা দেখে। তারা এতোটাই পশুতে পরিণত হয়েছিল যে পশ্চিম পাকিস্তানী মেয়েদেরকেও রেহাই দিচ্ছিল না। এ কে নিয়াজীর কাছে খবর ছিল- সৈনিকদের দ্বারা ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল দুজন পশ্চিম পাকিস্তানী মহিলা ধর্ষিত হয়েছেন এবং অন্য দুজন কোনো মতে বেঁচে গেছেন। এপ্রিলের ১৫ তারিখ এ কে নিয়াজী একটি গোপন নির্দেশ পাঠান তাঁর বাহিনীর সকল অংশের কাছে। এতে প্রথম বিষয়টি ছিল লুণ্ঠন, হত্যা ও ধর্ষণ সম্পর্কে সতর্ককরণ।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘বাঙালীর জাতীয়তাবাদ’ বইয়ে এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৪৯ বছর। কিন্তু এই দেশে এখনো প্রতিদিন ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শোনা যায়। পত্রিকার পাতা উল্টালেই খবর পাওয়া যায়, গুম-খুন-ধর্ষণের। দুঃখ-ক্ষোভে মানুষ ফেসবুক স্ট্যাটাসে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে লিখছে ‘ধর্ষিতা বোনের শাড়ি ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।’ কেউ বলে, ‘এ দেশ এখন গুম-খুন-ধর্ষণের জনপদে পরিণত হয়েছে। এই দেশে কেউ নিরাপদ নয়।’ কথাগুলো কতটা আক্ষেপের তা হয়তো রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা কর্তব্যরত শ্রেণীর বোধগম্য নয়। যদি বোধগম্য হত, তাহলে অবশ্যই এই অবস্থা বা পরিস্থিতি থেকে কীভাবে দেশ ও দেশের মানুষকে মুক্তি দেয়া যায়- তা নিয়ে ভাবতো, সে জন্য কার্যকরী উদ্যোগ নিতো। কিন্তু তা খুব বেশি পরিলক্ষিত নয়। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ পরিস্থিতি চলছে। চলছে ভয়ের সংস্কৃতি। ভয়ে মুখ খুলছে না ভিক্টিম। ….. ….. কী আছে আইনে? ধর্ষণকারীর শাস্তি নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রণীত হয় ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’।
পাঠকদের জন্য এ আইনের পুরোটা তুলে ধরা হল। ‘‘৯ (১) যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন। ব্যাখ্যা- যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন। (২) যদি কোন ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তাহার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিতা নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন। (৩) যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহা হইলে ঐ দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন। (৪) যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে- (ক) ধর্ষণ করিয়া মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন; (খ) ধর্ষণের চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন। (৫) যদি পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে কোন নারী ধর্ষিতা হন, তাহা হইলে যাহাদের হেফাজতে থাকাকালীন উক্তরূপ ধর্ষণ সংঘটিত হইয়াছে, সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ ধর্ষিতা নারীর হেফাজতের জন্য সরাসরিভাবে দায়ী ছিলেন, তিনি বা তাহারা প্রত্যেকে, ভিন্নরূপ প্রমাণিত না হইলে, হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যূন দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন। এই আইনের ৯ (১) ধারায় বলা হয়, যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।’’ উল্লেখ্য, ২০০ সালে প্রণীত আইনের আগে ধর্ষককে অর্থদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি ছিল না। বর্তমানে এ আইনেই বিচার করা হয় ধর্ষকের।
তবুও কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটে? ধর্ষণ কিংবা অন্যান্য অপরাধ পৃথিবীতে নিত্যদিনই সংঘটিত হচ্ছে। এ দেশেও সেই চিত্র দৃশ্যত। এর কারণ আইনের প্রক্রিয়াই ফাঁক থেকে যায়।
ধর্ষণকারী সহজেই পার পেয়ে যায় সেই ফাঁক দিয়ে। সমাজ ও রাষ্ট্রে বিদ্যমান অন্যান্য অপরাধ তাকে পার পেয়ে যেতে সহায়তা করে। বিচার ব্যবস্থাকে দীর্ঘায়িত করে। একটা প্রবাদ আছে “Justice delayed is justice denied” অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো সময়ের মধ্যে যদি কোনো ভিক্টিম আইনী প্রতিকার না পায় তবে সেই ভিক্টিম ন্যায়সঙ্গত বিচারও পাবে না। শুধু সময় বয়ে যাবে।
বিভিন্ন পরিসংখ্যানে ওঠে এসেছে যে, ভিক্টিম সঠিক আইনী বিচার না পাওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের অসহযোগিতা ও দায়িত্বহীনতার কথা। ঠিক সময়ে আদালতে প্রতিবেদন জমা না দেওয়াই বিচারকার্য দীর্ঘায়িত হয়েছে। তাই পুলিশ প্রশাসনের উচিৎ যেকোনো ধরনের বিচারকাজ যেন সঠিকভাবে পরিচালিত হয় তার দিকে সদা দৃষ্টি রাখা। কারণ তাদের উপরই নির্ভর করছে একজন ভিক্টিমের বিচার পাওয়া, না-পাওয়া। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে পুলিশের ওপরেও ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। কিছু সংখ্যক পুলিশের অপেশাধারী আচরণ ও অপরাধের জন্য পুরো পুুলিশ প্রশাসনের বদনাম হয়, তা কোনো ক্রমেই কাম্য নয়। তাই পুলিশ প্রশাসনের সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ তদন্তই হতে পারে, তাদের ওপর রাষ্ট্রের জনগণের আস্থা তৈরি করার একমাত্র উপায়। এছাড়া রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফলেও অনেক সময় ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের মতো ঘটনা ঘটেছে, ঘটে। এসব ঘটনা যেন না ঘটে তার জন্য প্রশাসন থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সজাগ হতে হবে, তারা যদি সদিচ্ছা পোষণ করেন তবেই সমাজে অপরাধ কমতে পারে। এছাড়া বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বৈপ্ল­বিক পরিবর্তনই পারে, সমাজ ও রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা ফেরাতে। মানুষের মানবিক দিকের পরবির্তনই হতে পারে, সমাজ বদলের হাতিয়ার। কেউ কেউ ধর্ষণের জন্য নারীর খোলামেলা পোষাককে দায়ী করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত যতগুলো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে অধিকাংশ নারীই ছিলেন বোরকা পরিহিত। যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, খোলামেলা পোষাক না পরলেই যে ধর্ষণ কমে যাবে, এ ধরনের চিন্তাবৃত্তি অযৌক্তিক। তাদের মননশীলেও পরিবর্তন কাম্য। আর একজন নারী যদিও খোলামেলা পোষাক পরে তবে কি তাকে ধর্ষণ বা টিটকারি করা যৌক্তিক? না, কোনোভাবেই তা যৌক্তিক না। সকলের মনে রাখতে হবে, ধর্ষণ একটি অপরাধ। চুরি-লুণ্ঠন-খুন করা ইত্যাদি যেমন অপরাধ, এটিও তেমনই একটি অপরাধ। এছাড়া রাষ্ট্র ব্যবস্থা তার আইন প্রণয়নে আরো সচেতন হতে হবে। সমাজে অপরাধ কমানোর জন্যই রাষ্ট্রের আইন তৈরি।
তাই প্রতিটি সরকারকে এ দিকে নজর দিতে হবে। সরকারের মনে রাখতে হবে চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের বলা কথাগুলো, ‘‌একটি পেরেকের অভাবে ঘোড়ার খুর কাজ করেনি। খুরের সমস্যার ফলে ঘোড়া কাজ করেনি। ঘোড়া না থাকাতে অশ্বরোহী সৈন্য পাওয়া যায়নি। অশ্বরোহী সৈন্যের অভাবে যুদ্ধে হেরে গেল। যুদ্ধ হেরে যাওয়াতে রাজত্ব হারালো। এ সব কিছু ঘটল ঘোড়ার খুরের একটি পেরেকের অভাবে।’ তাই ধর্ষণ কিংবা যে কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার আগে তা কেন ঘটছে এই রাষ্ট্রব্যবস্থায়, তার কারণগুলো খঁজে বের করতে হবে সরকারকে।
  • গোলাম রাব্বানী, লেখক ও সাংবাদিক

আরো দেখুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

যুক্ত হউন

21,994FansLike
2,943FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

সর্বশেষ